সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ। ভারতবর্ষে প্রবেশ করার পর বিভিন্ন বৈচিত্র দেখে তার সেনাপতি সেলুকাসের উদ্দেশ্যেই এই উক্তি করেছিলেন সম্রাট আলেকজান্ডার। উক্তিটি তৎকালীন সময়ে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে এই উক্তির সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে।আসল সত্য হলো গ্রীক ভাষায় আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাসকে কি বলেছিলেন সেটি পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। সম্ভবত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা "চন্দ্রগুপ্ত" নামক নাটকে আলেকজান্ডারের আবেগঘন অনুভূতি র মুহূর্তটি সম্পর্কে লিখেছিলেন, সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র দেশ এই উক্তিটি। ভিন্ন ভাষাভাষী সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হল পবিত্র ভারত ভূমি। ভিন্ন ভাষা সংস্কৃতির দেশে প্রতি মাসে কোন না কোন উৎসবে মেতে ওঠেন দেশবাসী। সেই বৈচিত্র্যময় দেশে বাঙালি সমাজ হলো এক অতি প্রিয় জনজাতি। কথায় আছে"বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ"। সে সমস্ত পার্বণের মধ্যে এক অতি প্রিয় উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ। একটি বাঙালির সার্বজনীন লোক উৎসব। চৈত্র মাসের শেষ ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে বাঙালিরা আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়। কল্যানা নতুন জীবনের প্রতীক হলো বাঙালির হৃদয়ের উৎসব নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত সম্রাট আকবরের সময় থেকে। সে সময়ে নববর্ষ পালিত হতো অর্ত ব উৎসব বা ঋতু ধর্মী উৎস ব হিসেবে। কৃষিপ্রধান এই দেশে কৃষি কাজের সঙ্গে নববর্ষ উৎসবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কৃষি কাজের সুবিধার্থে মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে ১০/১২ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন কে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে "ফসলি সন" নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।
তৎকালীন সময়ে নববর্ষ পালনের এক বিশেষ তাৎপর্য ছিল। সে সময় বাংলার কৃষকের চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করতো। পরেরদিন নববর্ষ স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। উপলক্ষে তখনকার সময় মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সেই থেকে পারিবারিক ও সমাজ জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভ দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে বর্তমানে। অতীতের সেই চিরাচরিত ধারা বাংলা নববর্ষের উৎসব ছিল "হালখাতা"। এটি পুরোপুরি একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামেগঞ্জে নগরের ব্যবসায়ী রা নববর্ষের প্রারম্ভের তাদের পুরোনো হিসেব-নিকাশ সম্পন্ন করে নতুন খাতা খুলতে ন। উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসুত্র স্থাপন করতেন চিরাচরিত অনুষ্ঠানটি আজো পালিত হয় আন্তরিকতার সঙ্গে তবে আধুনিকতার ঠেলায় দিন দিন এসব উৎসবের জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়ে আসছে।
নববর্ষ উৎসব বাংলার গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ দিনটিকে ঘিরে গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের উদ্দীপনা,উন্মাদনার শেষ থাকেনা। নববর্ষের আগে তারা ঘরবাড়ি ব্যবহার্য সামগ্রী সমস্ত কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। শুধু তাই নয় কৃষিভিত্তিক বাংলার কাছে এই দিন টা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পহেলা বৈশাখের ভোরের বেলা গৃহস্থের কর্তারা নিজ নিজ চাষের জমি, বাস্তুভিটা তে খড়ের আঁটি দিয়ে আগুন জ্বালায়। এই দিনে বাঙালির ঘরে ঘরে শিল নোড়া দিয়ে নিমপাতা ও কাঁচা হলুদ বাটা হয়। তারপর সেই মিশ্রণে একটু সরিষার তেল দিয়ে সবার প্রথমে মাখানো হয় বাড়ির গরু,ছাগল সহ নানান গৃহপালিত পশুকে। তাদেরকে নদীতে কিংবা বাঁধে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হয়। এরপর বাড়ির ছোটরা সমস্ত বড়দের পায়ে সেই মিশ্রণ দিয়ে আশীর্বাদ নেন। এই প্রাচীন রীতিনীতি বাঙালি সমাজে বহু যুগ ধরে চলে আসছে। তবে ইদানিং এইসব রীতিনীতি জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। সকালে স্নান সেরে সবাই পবিত্র হয়। সাধ্যমত নতুন বস্ত্র পরার চেষ্টা করে বাঙালিরা। নববর্ষের টানে ঘরে ফিরে আসে বাইরে থাকা সন্তানরা, আগমন ঘটে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের। এই দিন বাঙালির ঘরে ঘরে নানান পদের সমাহারে একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে।
নববর্ষকে উৎসব মুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। বিভিন্ন জায়গায় এই মেলার মাধ্যমে বৈশাখী উৎসবকে পালন করা হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য কারুপণ্য লোকশিল্প জাতীয় পণ্য কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর হস্তশিল্প সামগ্রী এই মেলার বিশেষ আকর্ষন। আবার কোথাও কোথাও এই মেলায় গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতি যেমন _যাত্রা পালা গান, কবি গান, জারি গান, গাজন গান, লোকসংগীত, বাউল সংগীত, ভাটিয়ালি গান পরিবেশন করা হয়ে থাকে। আবার লায়লা মজনু, ইউসুফ জুলেখা, রাধাকৃষ্ণের,মতো প্রভৃতি আখ্যান উপস্থাপিত করা হয় কোথাও কোথাও। আবার কোথাও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী,নাটক, পুতুল নাচ,নাগরদোলা,সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।তাছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ছিল "বায়স্কোপ"। বর্তমান সমাজে এই বাইস্কোপ একেবারে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। তবুও এসবের কারণ এই বৈশাখী মেলাকে বাঙালি সমাজের আনন্দঘন লোক সংস্কৃতির ধারক ও বলা হয়।
বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় পাল্টেছে নাগরিকদের জীবনযাত্রার ধরন। চারিদিকে বেড়ে চলেছে প্রতিযোগিতার পাল্লা। সময় কে কিনে নেবার প্রয়াস। বিশ্ব আজ তালুবন্দি। এসময় মানুষ প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতি ছেড়ে আপন করেছে এন্ড্রয়েড সেট ও ইন্টারনেট। বাঙালিয়ানা খাবার ছেড়ে সবাই হয়েছে রেস্তোরা মুখি। ভাত,ডাল,মাছআলুভাজা, পোস্ত ছেড়ে বাঙালি এখন চাউমিন, বিরিয়ানি চিকেন কাবাবে অভ্যস্ত হয়েছে। বাইরের জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ফলে মানুষ নিজেদের বিপদ নিজেই ডেকে আনছে অজান্তে। মানুষ অল্পতেই রোগব্যাধি গ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অল্প বয়সে মাথার চুলে পাক ধরেছে, চুল ঝরে গিয়ে বাড়ছে টাক ধারি মানুষের সংখ্যা। অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যাচ্ছে। দিনে দিনে সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারাচ্ছে নারীরা, সেই সঙ্গে বাড়ছে বিকলাঙ্গ সন্তানের সংখ্যা। তবুও কারো হুশ নেই। ধুতি-পাঞ্জাবি ছেড়ে বাঙালি আর টাই তে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইংরেজি আর হিন্দি ভাষার চাপে ভুলতে বসেছে বাঙালির অতিপ্রিয় বাংলা ভাষাকে। ধুতি-পাঞ্জাবি ভাত ডাল মাছ আলু পোস্ত ছেড়ে বাঙালি নিজের ভাষা সংস্কৃতি কে হারিয়ে অন্য ভাষা সংস্কৃতির দাস হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করার প্রবণতা সবথেকে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যুব সমাজের মধ্যে। যাদের মধ্যে আগামী ভবিষ্যতের স্বপ্নের বীজ লুকিয়ে থাকে, সেই যুবসমাজের হাত ধরেই লেখা হবে বাঙালির প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতির নিধনের ইতিহাস। তার জীবন্ত নিদর্শন হল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্তি ঘটছে পুরানো সভ্যতা-সংস্কৃতি। যেমন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পূণ্যাহ উৎসব এর বিলুপ্তি ঘটে। তখন পহেলা বৈশাখ ছিল জমিদারদের পুণ্যাহ র দিন।সেই সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানো গরুর দৌড় ঘোড়া দৌড় ষাঁড়ের লড়াই মোরগ লড়াই পায়রা উড়ানো নৌকা বাইচ বহুরূপী সাজ ইত্যাদি ছিল গ্রাম বাংলার অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও বিশেষ আকর্ষণ। আধুনিক থেকে আধুনিক তর হওয়ার লক্ষ্যে আজ এসব হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা-সংস্কৃতি পরিণত হয়েছে। যার ফলে বাঙালির অতিপ্রিয় পহেলা বৈশাখ ক্রমে ক্রমে একলা হয়ে যাচ্ছে।
বটু কৃষ্ণ হালদার । কবর ডাঙ্গা, কল_৭০০১০৪
পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালীদের কাছে ক্রমশ একলা হয়ে যাচ্ছে - বটু কৃষ্ণ হালদার
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ April 11, 2020 |
দেখা হয়েছে : 1408
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.