মুনার কথা শুনে পুরো স্তব্ধ হয়ে গেলো তহুরা। তার এই আটত্রিশ বছরের জীবনে এমন অবাক আর কখনই কেউ তাকে করতে পারে নি।
মুনা তখনও মাকে ডেকেই চলেছে অবিরাম ফোনে।
তপ্ত পানির ফোটা তহুরার দুচোখে অঝোরে ঝরছে তখন। মুনা অনুভব করতে পেরে আবারও বলে,
- মা, মাগো তুমি না আমার ভালো থাকার জন্য সব করতে পারবে বলো, তাহলে...
- ভিডিও কলে আয় মুনা। আমার চোখে চোখ রেখে আবার বল কথাগুলো। আমি দেখি এগুলো সত্যিই তোর মনের কথা নাকি দূরে চলে গেছিস বলে আমার দায় এড়ানোর ফন্দি আঁটছিস ফরিদকে নিয়ে।
এক ঝটকায় তহুরার মুখোমুখি আসে মুনা,
- মাগো বিশ্বাস করো ফরিদ অমন মানুষই নয়। সে আমার চেয়েও তোমাকে বেশি ভালোবাসে, আপন মা ভাবে।
তহুরা মলিন হাসি হাসে,
- মুনারে, এত অল্প সময়ে এতটা ভরসা তোর ফরিদের উপর? আমিও কিন্তু তোর বাবারে এমনটাই জানতাম।
- তুমি ভুল মানুষের কাছে পড়েছিলে মা। বিশাল একটা ভুলের পাকে তুমি পড়ে গিয়েছিলে। আমিতো তোমার জীবন থেকে দেখে আর ঠেকে ঠেকে শিখেছি মাগো। তবে আমি মানুষ চিনতে ভুল করিনি। ফরিদকে অনেকভাবেই আমি বাজিয়ে দেখেছি। তাকে সত্যিই ভরসা করা যায়। মা তুমি শুধু একবার সুযোগ দাও আমাদের তোমার জন্য কিছু করার। এতদিনতো শুধু সবার জন্য করলে, এবার নিজের ভাবনাটাই না হয় আমাদের উপর ছেড়ে দিলে।
তহুরা বিস্ময়ের চাহনিটা মেলে ধরে মুনার চোখের তারায়,
- আমার ভাবনাতো আমি ভেবেই রেখেছি। তোর নানার কাঁচা বাড়িটায় দালান তুলেছি, পাশে এক টুকরো জায়গাও কিনেছি। আর খাওয়া পরা? সেওতো চলছে মন্দ না। যতদিন পারবো কাজ কর্ম করে খাবো। একটাইতো পেট। কত আর লাগে।
- খাওয়াটাইতো বেঁচে থাকার একমাত্র চিন্তা না মা। যত বয়স বাড়ে মানুষ ততটাই একা হয়ে পড়ে। পাশে থাকার একটা সঙ্গীতো লাগে। নানা নানী মারা যাবার পর আমি আর তুমি সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে দিন কাটিয়েছি। এখন আমি আর ফরিদ গার্মেন্টসের কাজে দূরে চলে এসেছি। ঢাকায় আসবার পর থেকে একটুও স্বস্তি পাই না মা। তুমি কত একা হয়ে পড়েছো। তোমাকে এভাবে একা রেখে আমিতো শান্তি পাই না? কাজে মন বসে না আমার? আমার ভালো থাকার জন্যইতো আজীবন কষ্ট করে গেলে তুমি, আর একবার শুধু আমাকে ভালো রাখার জন্য আর একটা কথা রাখো।
তহুরা সরাসরি তাকালো মুনার মুখের দিকে,
- আমাকে পর করে দিয়ে তুই ভালো থাকবি? সত্যি ভালো থাকতে পারবি?
মুনা আদুরে গলায় ডাকে মাকে,
- মা, ও মা, পর করতে দিলেতো? তোমাকে পর করে দিবে এমন মানুষের কথা আমি কখনই তোমায় বলবো না। এ ভরসা তুমি রেখো মা।
- কিন্তু, আমি এখনও তার স্ত্রী। আমাকেতো সে তালাক দেয় নি কখনও। আইনেতো এটা হতে পারে না।
মুনার ঠোঁটের কোনে হাসি খেলে যায়,
- তুমি কি মনে করো, তোমাকে সেই মর্যাদায় এখনও রেখেছে তোমার স্বামী?
- তা কেন? কতকাল আগেই তার নতুন ঘর সংসার হয়েছে। আমাকে মনে রাখতে তার বয়ে গেছে।
- তাহলে? ঐ পুরনো অতীত আঁকড়ে ধরে আর কত সময় নষ্ট করবে মা? মন যেখান থেকে বের হয়ে এসেছে, মুখের তালাকে তার কিইবা এসে যায়। ওসব বড়লোকদের আইন, গরীবের কোন কাজে আসে না।
তহুরা একটুক্ষন চুপ করে থাকে। মোবাইল হাতে ওঠে দাঁড়ায় এবার, বলে,
- তুই ফোন রাখ মুনা। আমি আসছি। হ্যাঁ দেখতে আসছি, মানুষ চিনতে কতটাই অভিজ্ঞ হয়েছিস তুই। ফরিদকে বলিস কদিনের মধ্যেই আমি আসছি। ষ্টেশনে থাকতে হবে। নাম্বার খুঁজে বাসা খোঁজার ঝামেলা আমি করতে পারবো না। মুনার কথার অপেক্ষা না করেই তহুরা ফোনটা কেটে দেয় কথাকটি একটানা বলে।
তহুরার ট্রেন ছুটে চলেছে ভোরের আঁধার চিরে। ছেলেবেলায় বাবা মার সাথে যখন রেলে চেপে কোথাও যেতো তখন ঝুক্কুর ঝুক, ঝক্কুর ঝুক শব্দের তালে তালে কত কথা যে বলতো সুর কেটে কেটে। আর আজ শব্দের তালে তালে বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছে পিছন থেকে পিছনে, বহু সময় পিছনে, চোখের তারায় ভেসে ওঠছে অতীত ছবিগুলো একের পর এক---
একগাদা নিয়ম কানুন আর লম্বা সময় শেষে যখন কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে এয়ারপোর্টের ডাক্টে ঢুকে গেলো তহুরা, স্বস্তির নিঃশ্বাসটা নিতে গিয়েও কেমন যেন একটা ব্যাথা চিনচিন করে ওঠলো বুক জুড়ে। এগারো বছরের মুনার মায়াভরা মুখটা ভেসে ওঠলো দু' চোখ জুড়ে। আসবার সময় দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর নানীর শত অনুরোধেও বেরিয়ে এলো না। তহুরা রিকশায় ওঠতে গিয়ে আবারো পিছু হেঁটে বাসায় ঢুকলো। তখনও মুনা দাঁড়িয়ে ওভাবেই। পায়ের বুড়ো আঙুলে মাটি খুঁটছে আর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি অঝোরে।
আহারে কন্যা। এই এতটুকুন বয়সে মা কে ছেড়ে থাকবার আঁচটা সে ভালোই রপ্ত করে ফেলেছে। প্রথমবার যখন অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে তহুরার সবুজ পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে দেশ ছেড়েছিল তখন অবুঝ মুনা নানীর বুকের ওমে গভীর ঘুমে বিভোর ছিল। আঁচলের কোনে চোখ মুছতে মুছতে তহুরাই একাকার। ওর স্বামী হাবুল বারবার তাগাদা দিয়ে ওকে রিকশায় ওঠাতে পেরেছিলো শেষ পর্যন্ত। তহুরার ট্রাভেল ব্যাগটা পায়ের কাছে রাখতে রাখতে সান্ত্বনাও দিয়েছিলো, মন খারাপ করিস না বৌ। দেখতে দেখতে চারটে বছর কেটে যাবে। তুই এসে দেখবি তোর মুনা তখন পাঁচ বছরের মেয়ে। কত কথা কত গল্প জমিয়ে রাখবে তোর জন্য।
তুই ফিরলে কলোনিতে আমরা এই ছোট্ট ঘর ছেড়ে বড় ঘর ভাড়া করবো, মুনাকে স্কুলে ভর্তি করবো, ফেরি করে করে আর ঘুরতে হবে না আমাকে। ছোট্ট একটা দোকান নিয়ে অনায়াসেই ব্যবসাটা দাঁড় করাবো। আর তোকে কষ্ট করতে দিবো না একটুও। ব্যবসাটা ভালো করতে পারলে তোর জন্য একটা কাজের মানুষও রেখে দিবো। তুই শুধু মুনার খেয়াল রাখবি। স্কুলের জামা জুতো পরিয়ে দিবি। দিয়ে আসবি, নিয়ে আসবি। আর ছুটির দিনে আমি তুই আর মুনা ঘুরতে যাবো শহর ছেড়ে অনেক দূরে। মুনাটা সারাটা পথ কত যে হৈ হৈ করবে। হাবুলের দেখানো স্বপ্নে তহুরার মনটা সত্যিই ভালো হয়ে যায়। একটু আগের কান্নার পানি চিকচিক করে চোখের পাপড়িতে।
যথাসময়ে উড়াল দিলো তহুরা অজানায়, অচেনায়।
ফোনে ফোনে কথা হতে হতে হঠাৎ একদিন হাবুলের ফোন বন্ধ হয়ে যায়। একদিন দুদিন..পাঁচদিন.. দশদিন.. হাবুলের জন্য দুঃশ্চিন্তায় কান্নাকাটি করবার আগেই তহুরার বাবা জানায় চরম খবরটি যা তহুরাকে মারমুখি করে তোলে হাবুলের প্রতি। কদিন আগে হাবুল মুনাকে তার নানা নানীর কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে ফিরে গেছে তার গ্রামে এবং কদিন পরেই নতুন বৌ নিয়ে ঘরে তুলেছে। যে ঘর একটু একটু করে তিলে তিলে সাজিয়ে রেখে এসেছিলো তহুরা অনেক স্বপ্ন চোখে এঁকে।
তহুরা নিজেকে শক্ত করে। মুনার অসহায়ত্ব দুচোখে ভেসে বেড়ায়। বাবামাকে সতর্ক করে দেয় কোনভাবেই হাবুলের কাছে যেন মুনাকে না দেয়।
বছর চার পরে দেশে ফিরে আসে তহুরা। পাঁচ বছরের মুনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মায়াভরা টলটলে মুখটি দেখে প্রতিজ্ঞা করে যত কষ্টই হোক মুনাকে লেখাপড়া শিখাবে। নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে তবেই বিয়ে দিবে।
স্কুলে যায় মুনা। এক এক করে এগারো বছরের কিশোরী হয়ে ওঠে। দু ' চারটে বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। তহুরার মা বাবা বুঝায়,
- তহুরারে, দেখেশুনে একটা ভালো ঘর পেলে বিয়ে দিয়ে দে। আমাদেরও বয়স হচ্ছে। জমানো টাকায় কতদিন মেয়েকে পড়াবি? মেয়ের নিরাপত্তারওতো বিষয় আছে?
তহুরা চেঁচিয়ে ওঠে,
- না, কিছুতেই না। তোমাদের মত ভুল আমি করবো না। অন্যের খাওয়া পরার ভরসায় মেয়েকে আমি পানিতে ফেলবো না। আল্লা চাইলে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দেই ঘর বাঁধবে।
শুরু হলো তহুরার আবারো ওঠে দাঁড়ানো নতুন করে। আগের বারের অভিজ্ঞতার পথ ঘাট জানাই ছিল। এবার আর এক প্রান্তে উড়াল দিলো তহুরা। আরও বেশি রিয়ালের বেতনে। টানা আট বছর পর পুরোপুরি ফিরলো তহুরা। মাঝে একবার এসে অসুস্থ বাবাকে দেখে গিয়েছিলো শুধু। পরবর্তী চার বছরের মাথায় বাবাকে হারাতে না হারাতে মাও শয্যাশায়ী হলেন। তহুরা ফিরলো আঁটঘাট বেঁধেই। মায়ের মৃত্যুর পর মাটির বাড়ি ভেঙে পাকা দালান ওঠালো। ততদিনে মুনা কলেজ শেষ করে গ্রামের এক মুরুব্বির সহায়তায় শহরের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির চাকরীতে বহাল হলো। ঠেকে ঠেকে চলতে শেখা তহুরা নিজ গাঁয়েই নিজেকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রেখে নিজের চাহিদার যোগানও নিজে শুরু করলো।
এরই মাঝে ফরিদের আলাপ আলাপনের খবরাখবর জানায় মুনা মাকে। একই ফ্যাক্টরিতে একই পদে চাকরী করে। লেখাপড়াতেও সমান। অসুবিধা নাই তহুরার। মানুষ ভালো হলেই হয়। দুজন দুজনকে সম্মান করবে, মর্যাদা দিবে ব্যস। সুখে দুঃখে একসাথে থাকবে। দুজন দুজনের উপর নির্ভরশীল হবে।
ফরিদের বাবাকে প্রস্তাব নিয়ে আসতে বলে। তহুরাও গাঁয়ের দু'চারজন নিয়ে ঘর বর দেখে শুভ কাজটা সম্পন্ন করে।
বছর না ঘুরতেই মুনা আর ফরিদ ঢাকায় আরও বড় ফ্যাক্টরি থেকে ডাক পায়। ছোট শহরের চেয়ে সবদিক থেকেই উন্নতমানের। কিন্তু মুনার এক ভাবনা। মার সাথে পথের দূরত্বটা অনেক হয়ে যাবে। মন চাইলেই ছুটে দেখতে আসা যাবে না।
ভাবতে ভাবতে আপন মনে হাসে তহুরা। মেয়েটা হয়েছে ঠিক তারই মত। সারাক্ষণ মাকে নিয়ে চিন্তা। মাকে ভালো রাখার চিন্তা। ট্রেনের ঝাকুনি আর হুইসেলের বিকট চিৎকারে জানালায় চোখ রাখে তহুরা। ট্রেনটা ধরে ধীরে প্লাটফর্মে ঢুকে পড়েছে। কামরায় শুরু হয়ে গেছে যাত্রীদের মালামাল নামানোর তাড়া। ঐতো ফরিদ, পাশে দাঁড়িয়ে মুনাও হাত নাড়ছে।
ফরিদই প্রথমে কথাটা কানে তুলেছিলো মুনার। মুনা ভীষন রাগও হয়েছিলো। নিজের ছেলে হলে মাকে নিয়ে এমনটা ভাবতে পারতে?
- কেন মুনা? যে মানুষটা জীবনভর বাবা মা সন্তানের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিলো, তার জন্য কি ভালো কিছু তুমি সন্তান হয়ে করতে পারো না?
- তাই বলে এ বয়সে বিয়ে? লোকে কি বলবে?
- যা ইচ্ছা বলুক। যখন তের চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ের নামে বলি দিয়েছিলো মাকে তার বাবা মা, না খেতে পেয়ে বছরের পর বছর ঘর ছেড়ে দেশ ছেড়ে শ্রম বিকিয়ে তোমাকে বড় করেছিলো তখন কোন লোকতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়ায়নি। তাহলে লোকের কথায় তোমার কি এসে যায়? মা ভালো থাকবে কি না এটাই ভাবার বিষয়, আর কিছু না।
মুনা কিছুটা স্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
- কিন্তু সে মানুষটা যে ভালো রাখবে তার নিশ্চয়তা কি?
- নিশ্চয়তা কিছুই না। যেভাবে তুমি আমাকে ভরসা করেছো, আমি তোমাকে। ঐ যে মা বলেন, কেউ কারো উপর নির্ভরশীল নয়, আবার দুজনেই দুজনের উপর নির্ভরশীল। এটাই। আর আমরা ভাবছি বলেই যে মা তাতেই বাধ্য, তাও নয়। মা দেখবেন, শুনবেন। মতামত দিবেন। দোকানি চাচাও দেখে শুনে মত জানাবেন।
হ্যাঁ দোকানি চাচাকে মুনাও চেনে। ফ্যাক্টরির সামনেই দোকান। আসতে যেতে প্রায়ই চাচার দোকান থেকে এটা ওটা কেনাকাটা হয়। একা মানুষ। বিয়ে করেছিলেন। নতুন বৌ তারই বন্ধুর সাথে পালিয়েছে। সেই থেকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে আর সংসার গড়েন নি। পৃথিবীতে আপন বলতেও কেউ নেই।
ফরিদ আর ফরিদের বৌকে খুব স্নেহ করেন। বলেন,
- সারাজীবন এমন একসাথেই থেকো। শেষ জীবনে একজন বিশ্বস্ত সাথী খুব দরকার। নিঃসঙ্গতার মত কষ্ট আর নেই। এমন শাস্তি যে পায় সেই জানে।
ফরিদ বলেছিলো,
- শাস্তিটা না পোহালেই হয়? ঘরে সংগি আনলেই তো ল্যাঠা চুকে যায় চাচা।
- এত সহজ নারে বাবা। এমন নিঃসঙ্গ, এমন স্বজনহীন ছাড়া আমার দুঃখ কেউ বুঝবে না।
- বললে আমরা ঘটক লাগাই চাচা?
হাসেন দোকানি চাচা,
- ঘটক লাগবে না বাবা। যদি আমার একাকীত্বের সাথে কারো একাকীত্ব মিলে যায় তবে কেউ রাজি হলে তোমরাই নিয়ে এসো। আমি রাজী।
অবশেষে মুনারও মনপুত হয় বিষয়টা। সত্যিইতো, মা যদি জীবনটা গুছিয়ে একটু থিতু হয়ে বসতে পারে ক্ষতি কি।
ফোনে একের পর এক বহু কথা কাটাকাটি, মান অভিমানের এক পর্যায়ে মুনা আর ফরিদকে কথা দিতে বাধ্য হলো তহুরা ঢাকায় আসবে। শর্ত একটাই দেখে শুনে মতামত দিবে তহুরা, হ্যাঁ অথবা না।
অতঃপর তহুরা ঢাকায়। মুনা-ফরিদের ছোট্ট একরত্তি সংসারটা দেখে মনটা ভরে ওঠেছে তহুরার কানায় কানায়। পরদিনই ওদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বিকেলে কাঙ্খিত অতিথি আসবে। ছোট খাটো আয়োজন চলছে মহা উৎসাহে ফরিদ আর মুনার। এখানে চেয়ারটা, ওখানে ছোট্ট চায়ের টেবিলটা। একচিলতে রান্নাঘরেও আয়োজনের রেশ। পায়েশের সুগন্ধী চালের গন্ধ মৌ মৌ করছে। বড় গামলায় ভিজছে বিভিন্ন ফল। ফরমালিনের অত্যাচারে এটাই উপায়। নতুন মিষ্টির প্যাকেটের সাথে ছোট্ট ফ্রিজটায় রাখা হয়েছে লেবু শরবতের মগটাও। টুকিটাকি আরও কত কিছু। তহুরার চোখ ঝাপসা হয়। ওর সেই ওঠতি বয়সের ছবিটা আবছা আবছা মনে পড়ে। রমিজা, নুরেসা আর নুরজাহান মিলে সেদিন ওরা গিয়েছিলো গাঁয়ের একপ্রান্তে বয়ে যাওয়া শিতলা নদীতে। চার সখিতে উথাল পাথাল সাঁতার কাটায় মেতে ওঠেছিলো। হঠাৎ নদীর কিনারে দাঁড়ানো বাবার ডাক কানে এলো।
- তহুরা, শিগগীর ওঠে আয় মা। বাড়িতে মেহমান এসেছে ভিন গাঁয়ের। তোর মা একা হাতে পেরে ওঠছেনা। তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।
ততক্ষণে উঠোন ভর্তি অচেনা মুখগুলির আপ্যায়ন চলছে। তহুরা ঘরের পেছন দিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই পাশের বাড়ির সুফিয়া ভাবী ওর গায়ে জড়িয়ে দিলো গোলাপি রঙা শাড়িটি। মুখে পাউডার ঘষে ভেজা চুলগুলিকে মুছে শুকিয়ে কোন মতে গেঁথে দিলো পিঠ দোলানো লম্বা বিনুনী। তারপর ধীর পদক্ষেপে আসরের মাঝখানে রাখা পাতা মোড়ায় বসিয়ে দিল। এটা ওটা জিজ্ঞেস, ঘোমটা খুলে চুল দেখা, হাঁটা চলা কত পরীক্ষা যে হলো। তহুরা পাশও করলো। বিয়েটা হাবুলের সাথে হয়ে গেলো তাই।
- মা, ও মা কি ভাবছো এত? মেহমান আসবার সময় হয়ে এলো যে। শাড়িটা পাল্টালে ভালো হয় মা।
মুনার কথায় বাস্তবে ফিরে তহুরা। কেমন যেন কিশোরি লজ্জায় ডুবে যায়। আমতা আমতা করে বলে,
কেনরে এইতো ঠিক আছি। এ বয়সে এসব..
ফরিদ দোকানি চাচাকে আপ্যায়নের ফাঁকে ফাঁকে গল্প জুড়ে দিয়েছে খুব। দোকানি চাচাও বহুদিন পর এমন ঘরোয়া পরিবেশে ভীষনভাবে আপ্লুত হয়ে ভাবছেন, আহারে এমন সোনার টুকরো ছেলেমেয়েতো তারও থাকতে পারতো। এমন সাজানো ঘর, এমন কাছের মানুষ..
- আসসালামু আলাইকুম।
সৌজন্যতা সেরে সামনের চেয়ারটা একটু পিছনে টেনে বসলো তহুরা। তারপর, অপলক তাকিয়ে রইলো সরাসরি দোকানি চাচার মুখের উপর বড় বড় চোখ করে। পাশে দাঁড়ানো মুনাকে ফরিদ তাড়া দিলো
- মুনা আমরা বরং চা টা বানিয়ে আনি চলো। উনারা নিজেরা যা যা জানবার জেনে নিক নিজেরাই। আমরা চা খেতে খেতে আপনাদের দুজনারই কথা জানবো।
- তার আর দরকার হবে না। এখনি বলছি।
গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠলো তহুরা। এরপর বলেই চললো একটানা,
- মুনা তুই তখন বলছিলি না আইন শুধু বড়লোকদের জন্য। গরীবের ওসব লাগে না। কিন্তু আমার মনটা খুঁত খুঁত করছিলো ধর্মেতো বড়লোক গরীব নেই। ধর্মেও আদেশ নিষেধ থাকে। এখন সেটা নেবার সুযোগ যখন এসেছে দেরি করা ঠিক হবে না। সামনের এই লোকটাই আমার স্বামী হাবুল । তিন তালাকটা উচ্চারণ করে আমাকে দয়া করতে বল। আমি মুক্ত হয়ে আগামীতে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে জীবন শুরু করতে চাই ভালো মানুষ খুঁজে নিয়ে।
দোকানি চাচা বিস্ময়ে ওঠে দাঁড়িয়ে তহুরার মুখের দিকে নিষ্পলক দেখতে দেখতে আচমকা হাত দুটো ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠলো,
- তহুরা তুমি? তার মানে ফরিদের বৌ আমার মেয়ে মুনা? আমি এতদিন চিনতে পারি নি। কতবার কতদিন লজ্জায় অনুশোচনায় তোমার সামনে যেতে চেয়েছি, সাহস পাই নি শত চেষ্টা করেও। আজ নিয়তি যখন মুখোমুখি করলো তখন তুমি এ কি বলছো তহুরা। আমাকে মাফ করা যায় না?
মুনা ঘুরে দাঁড়ায়,
- নাহ্ কিছুতেই না। আপনাকে মাফ করা যায় না। কিশোরি তহুরা বাবামায়ের ভুলে আপনার মত ভুল মানুষের সাথে ঘর বেঁধেছিল। আবার আমারই কারণে একই ভুল আমার মা করতে পারে না। আমি তহুরার বাবা মার মত বোকা হতে চাই না, আমি তহুরার মেয়ে মুনা।
মালিবাগ, ঢাকা।