অনেকেই জানেন রেগুলার ফলোআপ এর জন্য আমি নিয়মিত বিরতিতে প্রিন্সেস মার্গারেট হাসপাতালে যাই। এই ফলোআপগুলো সাধারনত শুক্রবারে হয়। প্রিন্সেস মার্গারেট পৃথিবীবিখ্যাত ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার। যখনই যাই, ওই দু-তিন ঘন্টায় শত শত ক্যান্সার রোগী আর তাদের সঙ্গীদের সাথে দেখা হয়। আমি তাঁদের দেখি আর অবাক হই! চারপাশে বসা রোগী আর তাদের সঙ্গীরা যেন আমাকে জীবনের মানে খুঁজতে সাহায্য করেন। আমি যতটা পারি তাদের সাথে পরিচিত হই, কথা বলি। নানান টেস্ট এর ফাঁকে অপেক্ষার ওই সময়টাতে মাথায় আসা বিভিন্ন ভাবনাগুলো এর আগেও কয়েকবার শেয়ার করেছি। হাসপাতালের ওই সময়টাতে যেন আসলেই আত্মিক শিক্ষার এক বিশাল পাঠশালায় প্রবেশ করি।
বন্ধুদের একটা কথা বলি। বীর-দর্শন করতে চান? এইরকম ক্যান্সার হাসপাতাল-এ গিয়ে এমাথা থেকে ওমাথা একবার হেটে আসুন। দেখতে পাবেন শীর্নদেহ আর কেশহীন মাথা আর মুখ নিয়ে হুইলচেয়ারে নির্লিপ্ত বসা মাত্রই ৪৫ পেরুনো অ্যাডাম-কে। এই কয়েকদিন আগেও রমণীমোহন তাগড়া জওয়ান ছিলো সে।আর আজ কিভাবে অত্যাসন্ন মৃত্যুর চোখরাঙান ভুলে হাতের টিম হর্টন কফির কাপটাতে ছোট্ট ছোট্ট চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। আর তার ভালবাসার সামান্থা সেই হুইলচেয়ারের হাতল ধরে বসা, চোখেমুথে যুদ্ধের দামামা, যমরাজের কাজ সহজ হতে দেবেনা একদমই। মন ছুয়ে যাওয়া ভালবাসার ছোট্ট গল্প দেখতে চান? দেখে আসুন কি অবাক আত্মবিশ্বাস আর ভালবাসা নিয়ে প্রায় ৭০ পেরোনো পান্জাবী বংশোদ্ভুত পরমজীত কাওর শক্ত করে ধরে আছে প্রায় ৮০ ছুঁতে চলা সরতাজ সিং গাওরী এর হাত! সরতাজের বয়সটা এমন কঠিন চিকিৎসার জন্য অনুকুল নয়, তাতেও দমে যাবার পাত্র-পাত্রী নন পরমজিত আর সরতাজ। প্রকৃত বন্ধুত্ব আসলে কেমন দেখতে চান? দেখে আসুন নাম না জানা সেই কালো মহিলাকে, যার পাশে বসে সামনে গল্প করে যাচ্ছেন তার বন্ধু। দুজনের গল্পের ফোয়ারার তোড়ে চলমান সব সংকট-সংশয় যেন ভেসেই চলে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, যখন একজন সৈন্য যুদ্ধে যায়, সে জানে যে “হয়তো” ফিরে আসবে, “হয়তো” না। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রেই একজন ক্যান্সার রোগীকে জানিয়ে দেয়া হয় তার মৃত্যুর আনুমানিক সময়টা। কোন “হয়তো” থাকেনা। তাই চারিদিকে দু-তিনটা যন্ত্র লাগানো হুইলচেয়ারে নির্লিপ্ত বসা অ্যাডাম কে আমার সম্মুখসমরে বিশ্বজয়ী কোন এক বীর থেকে কম কিছু মনে হয় না।
আমি দেখি আর গভীর ভাবনার জগতে চলে যাই। লোকদেখানো মায়াহীন এই শহরে এইসব সম্পর্কগুলোই হয়তো মানুষের উপর বিশ্বাস স্থির রাখে। অনেকেই আমার কাছে জানতে চান এত এত অবস্টাকল মাথায় নিয়েও উদয়াস্ত এত দিকে ছুটে চলার শক্তি কই পাই। আমি বলি - শক্তি পাই চারপাশে ঘিরে থাকা আপন মানুষগুলো থেকে। শক্তি পাই অর্থে-বিত্তের মোহ থেকে মুক্তিতে। শক্তি পাই ড্যানফোর্থের সস্তা চায়ের কাঁপে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ সামনে পরে যাওয়া পরিচিত কোন ভাই/বোনের ভালবাসার আলিঙ্গনে। আমি তাদের বলি যে এত লক্ষ কোটি মানুষের মাঝে আল্লাহ দয়া করে আমাকে বেছে নিয়েছেন সরাসরি বিশ্বাস, শক্তি আর সাহসের পরীক্ষা করার জন্য, এটাতো বিশেষ এক সুযোগ। আর এই পরিক্ষার উসিলায় জীবনের কত গভীর আর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোও অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছেন, যা ৮০ বছর সুস্থ্যভাবে বেচে থাকলেও হয়তো পেতাম না। জীবনচক্রে সময়, সম্পর্ক, অর্থ-বিত্তের এসবের আসল মুল্য আর যথাযথ হকদারদের চিনতে পারাটাই মনে হয় জীবনের একটি বড় সফলতা। আমাদের অনেকের দুর্ভাগ্য হল যে আমরা চোখ থাকিতেও অন্ধ হয়ে থাকাতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই মেকি সব সম্পর্ক আর ঐশ্বর্যের চাকচিক্যতেই নিজেদের ভুলিয়ে রেখে দিন পার করে দেই। আমরা কিন্তু বুঝি/জানি কে আপন কে পর, সময়ে কে এসে পাশে দাঁড়াবে, সময় শেষে কে দু-বেলা একটু স্মরণ করবে। স্বাভাবিক জীবনে সেসব মানুষের সংখ্যা খুব বেশি হবেনা, এটাও কিন্তু স্বাভাবিক। তবে স্বল্পসংখ্যায় হলেও যদি এঁদের যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়, প্রাপ্য অধিকার দেয়া হয়, দেখবেন দিনশেষে এঁরা একজনই একশজনের হিম্মত দেবে। আর আমাদেরও মেকি সব ঐশ্বর্য আর শতশত সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে দিবানিশী প্রানপাত করতে হবেনা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের স্বল্প এই সময়টা নিজের প্রকৃত কল্যাণে খরচ করার প্রজ্ঞা দিন।
রিজওয়ান রহমান
টরন্টো, কানাডা
কর্কট যোদ্ধার গল্প - রিজওয়ান রহমান
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ April 29, 2023 |
দেখা হয়েছে : 629
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.