আজকের দিনে মানুষের জীবন ও মনুষ্য সমাজের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে রাজনীতি। এই রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই মানুষের সামগ্রিক জীবনের রথচক্র আবর্তিত হয়। রাজনীতি বর্তমানে বহুল চর্চিত একটি বিষয়। কিন্তু রাজনীতি বলতে কি বোঝায়? রাজনীতি হল ন্যায়নীতি ও আদর্শ অবলম্বন করে রাজ্যের জনগণের কল্যাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা। কোন দেশের রাজনীতি সেই দেশের আপামর জনসাধারন কে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের ভাষ্যমতে, এদেশের রাজনীতি জনগনের জন্য করা হয়। তবে, বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। বর্তমানে রাজনীতিবিদদের একটাই লক্ষ্য ন্যায়নীতি বর্জিত করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা। কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাজনীতিটাকে তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করতে করতে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছেন, যে বতর্মানে রাজনীতির প্রেক্ষাপটটা রীতিমত নির্লজ্জ ও বেহায়া পনায় ভরে গেছে। আর রাজনীতিটা যত বেশী কলুষিত হচ্ছে, সাধারন মানুষ দিন দিন তত বেশী অসহায় হয়ে পড়ছে। রাজনীতি আসলেই কঠিন, যদি রাজনীতির মধ্যে নীতিটাকে মানতে চান। নীতিটা হলো, নিজে সৎ থাকা, সততাকে উৎসাহিত করা, মেধা ও দক্ষতাকে উৎসাহিত করা। নীতিটা হলো, মানুষকে একত্র রাখা, উৎসাহিত করা, মানুষকে উজ্জীবিত রাখা, মানুষকে শ্রমমুখী ও সততামুখী করা, পৃথিবীর বুকে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার তাগাদা সৃষ্টি করা, নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে লালন করা এবং আগামীর দিকে সুদূর দৃষ্টি প্রসারিত রাখা। রাজনীতিবিদরাই সমাজের নানা সমস্যা চিহ্নিত করবেন এবং সেগুলোর সুষ্ঠু সমাধান করার জন্য নেতৃত্ব দেবেন। মানুষকে সঠিক পথ দেখাবেন এবং দিকনির্দেশনা দেবেন।
এরূপ নীতিতে বহাল থেকে রাজনীতি করে কয়জন?
বর্তমান রাজনীতি হল এক অসুস্থ রাজনীতি। যেখানে নেই কোন সততা, নেই কোন জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা অনেকাংশে বিলুপ্তপ্রায়। আছে শুধু দূর্নীতি ও আত্মসাৎ এর এক চরম প্রতিযোগিতা। অনৈতিক কর্মকান্ড ও পেশীশক্তিই হচ্ছে চালিকাশক্তি।
অথচ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতেই রয়েছে দেশ ও জাতির কল্যাণ, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং সুস্থ সমাজ গঠনের চাবি। রাজনীতি সুস্থ না হলে বিভাজনের অভিশাপ থেকে এ জাতি মুক্তি পাবে না। অসুস্থ রাজনীতি নিকটকে দূর করেছে। আপনকে পর করেছে। ঐক্যের গ্রন্থি শিথিল করে বিভক্তির মাত্রা বাড়িয়েছে। সহনশীল উদারতাকে নির্বাসন দিয়েছে। বিভক্তির আগ্রাসনে সমগ্র জাতীয় জীবন আজ ক্ষতবিক্ষত। এ বিভক্তির অবসান না ঘটলে বাইরের চাপ বা শত্রুর প্রয়োজন হবে না। শুধু অন্তঃস্ফোটনের মাধ্যমেই জাতির ধীশক্তিসহ অন্তরাত্মা পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে পড়বে। ধসে পড়বে হাজার বছরে গড়া জাতীয় সৌকর্যের সৌধটি পর্যন্ত।
রাজনীতি মানুষের জীবনকে শ্রেষ্ঠ পর্যায়ে নিয়ে যায়, আবার কোনো কোনো রাজনীতি মানুষের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস করে। সৎ কাজ ও সৎ অর্থ খরচ করে মানুষের কল্যাণে কাজ করাকে সুস্থ রাজনীতি বলে এবং এই রাজনীতি মানুষকে খ্যাতি ও সম্মানের উচ্চশিখরে পৌঁছে দেয়। অসৎ কাজ ও অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করলে যে কারও রাজনৈতিক জীবন জন্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তার স্ত্রী-সন্তানরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, জনগণের টাকা আত্মসাৎকারীরা হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী। সুস্থ ধারার রাজনীতি হল, নিজেকে জনগণের গোলাম ও সেবক মনে করে জনগণের সেবা ও কল্যাণের চিন্তা মাথায় নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা। রাজনীতিতে উত্থান-পতন উভয়ই থাকে। নিজের সৎ পথে উপার্জিত টাকা খরচ করে বা নিঃস্বার্থভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করে জনগণের দোয়া, ভালোবাসা অর্জন করার মাধ্যমে একজন রাজনীতিকের জীবন সফল ও সার্থক হয়।
দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি না হলে দেশকর্মী হওয়া সম্ভব নয়। এ জন্যই আজকের দেশের এই অসুস্থতা ও স্বার্থপরতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা বিবর্ণ রাজনীতি যখন তারুণ্যকে সঠিক পথনির্দেশনা দিতে পারছে না, বরঞ্চ বিভ্রান্তি ও লোভের বৃত্তে ফেলে দিচ্ছে তখন এদের উদ্ধার ও আলোকিত পথ দেখানোর দায় তো রয়েছে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব অগ্রজের। কিন্তু যে পথকে অনেক আগেই আমরা বন্ধুর করে ফেলেছি- করে ফেলেছি অচেনা, সে পথের খোঁজ পাওয়া ও হাঁটা সহজ নয়। নষ্ট রাজনীতি আজ তারুণ্যকে বিভ্রান্ত করেছে। সন্ত্রাসী বানিয়েছে। দুর্নীতিপরায়ণ করে তুলেছে। যুব বা ছাত্রসমাজ যখন রাজনীতিতে আদর্শের বলি দিয়ে নীতিহীন অপরাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে তখন তাদের মধ্যে দেখা দেয় নানা অনাচার, অসংগতি, নানা অবক্ষয় যেটা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্য, যে শক্তি ও সাহস কর্মউদ্দীপনা দেশ জাতির কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার কথা তার পরিবর্তে তারা এখন বিপথগামী, অসৎ, মূর্খ, অশিক্ষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিজেদের নেতা হিসাবে গ্রহন করে সামাজিক অবক্ষয় ডেকে আনছে।
অসুস্থ রাজনীতি শুধু একটি দেশকে ধ্বংস করে না, ধ্বংস করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও। সুস্থ ধারার রাজনীতি দেশের অর্থনৈতিল ব্যব্স্থাকে বেগবান করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখে। ব্যক্তি ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। একথা সত্য যে, জনগণ হয়তো কিছু একটা পাওয়ার জন্যই রাজনীতিবিদদের সম্মান করে, পেছন পেছন ঘোরে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সমাজের সমস্যা সমাধানের প্রাথমিক যোগ্যতা রাজনীতিবিদদের অনেকেরই নেই। তাদের পড়াশোনার যোগ্যতা যথেষ্ট থাকে না এবং একজন রাজনীতিবিদের যে প্রজ্ঞা, জ্ঞান, বুদ্ধি, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, মেধা, ধৈর্য, মনোবলসহ নানা গুণ থাকা দরকার, এমন গুণাবলি অনেক রাজনীতিবিদের নেই। ফলে এই কলুষিত রাজনীতি সমাজে অনৈক্য, অবক্ষয় ডেকে আনছে।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সম্পর্কে সমাজ তথা জনগণের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশেই নেতিবাচক। সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে জনগণ ধরেই নিয়েছে, রাজনীতিবিদের অনেকেই খারাপ মানুষ।ব্যক্তিস্বার্থেই লোকরা রাজনীতিতে আসছে এবং রাজনীতি করছে। তাই সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে সৎ,জ্ঞানী, মেধাবী লোকদের রাজনীতিতে বেশি এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সমস্যা সমাধান করে একটি দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে অগ্রগতির সোপানে উপনীত করা রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়া আর কোনো শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল রাজনৈতিক শক্তিই পারে সঠিক পথ দেখাতে। এ লক্ষ্যে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতেই হবে।
মোবারক মন্ডল
করিমপুর, নদীয়া
অসুস্থ রাজনীতি সমাজের অবক্ষয় - মোবারক মন্ডল
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ August 28, 2022 |
দেখা হয়েছে : 1266
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.