অটোয়া, শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আমার কিশোরীবেলার পাঠশালা - গুলজাহান রুমী

By Ashram | প্রকাশের তারিখ January 13, 2019 | দেখা হয়েছে : 2910
আমার কিশোরীবেলার পাঠশালা - গুলজাহান রুমী

এক
নে পড়ে, সেই কোনকালে গিয়েছিলাম পাঠশালায় প্রথম। দুরুদুরু বুকে রাজ্যির বিষ্ময় নিয়ে যেন এই সেদিন গেলাম, কিন্তু অনেকটা দিন গড়িয়ে গেছে এরই মধ্যে। যে দিনগুলো কোনো দিন আর ফিরে আসেনা। তবু আসে, স্মৃতির রেলগাড়িতে চড়ে আসে। স্মৃতিটা জানিয়ে যায়, আমি ছিলাম , আমি আছি দূর অতীতে। তুমি হাত বাড়ালেই ছুঁতে পার। কিন্তু না, ছোঁয়া যায়না। স্বপ্নের মত আসে তারা। আমার প্রথম পাঠাশালা যাত্রার স্মৃতিটা এত জীবন্ত হয়ে আছে আমার মাথার কোঠরে যা এতদিন পরেও একটু ফিকে হয়ে যায়নি। মুরাদ নগর পাঠশালাটা কি এখন আছে ঠিক যেখানটিতে ছিল? ঠিক আগের মতই কি আছে?  মনে হয়না। হয়তো বদলে গেছে অনেক কিছুর সাথেই। কিন্তু আমার স্মৃতিতে আছে। মুরাদ নগর পাঠশালাটা এখন দেখতে কেমন হয়েছে খুব জানতে ইচ্ছে করে। এই পাঠশালার মত হাজার হাজার পাঠশালা রয়েছে মফস্বল বাংলায়, গ্রামেগঞ্জে। তবু মুরাদনগর সদরের পাঠশালা আমার স্মৃতির মানচিত্রে ছবির মত অনন্য আর বিশেষ। 

আমাদের বাসা থেকে খুব কাছে স্কুলটা। মিনিট তিনেক হাটলেই পৌঁছা যায় সেখানে। বেশ কয়েকটা কক্ষ নিয়ে লম্বা একখান টিনের ছাওনি দেওয়া দালান। সামনে চওড়া মাঠ, যেখানে নিত্যদিন আমার চেয়ে কিছু ডাঙর ছেলেমেয়েরা খেলতে দেখেছি। ঘন্টি বাজলে দামাল কচিকাঁচার দল হুল্লোড় করতে করতে পাঠকক্ষে মিলিয়ে যেতে দেখেছি। আবার ঘন্টি বাজলে কিচিরমিচির করে বেরিয়ে মাঠ কাঁপিয়ে দৌড়ঝাপ, গড়াগড়ি দিতে দেখেছি তাদের।বাসায় যখন বলাবলি হচ্ছে আমাকে স্কুলে পাঠানো হবে তখন এই রহস্যঘেরা দালানটা আমার কাছে আরও রহস্যময় হয়ে উঠে। মাঠটাকে মনে হয় রুপকথার পরী নাইটের আনন্দমঞ্চ। আমার দিন ফুরোতে চায়না। কিন্তু সব অজানা আনন্দ হাতের মুঠোয় আসার ইচ্ছেগুলো হঠাত ধপ করে নিভে যায় যখন মনে আসে স্কুলে পড়া নাশিখতে পারলে বেত্রাঘাতের শাস্তির কথা।আমি আদতে খুব ভীতু ছিলাম। মনে হয় এখনও আছি। তবু মনে সাহস দেবার চেষ্টা করি, নিজেকে বুঝাই, আমি থানার বড় বাবুর মেয়ে।

গোমতীর তীরে মুরাদনগর। স্কুলের মাঠটার একপাশ দিয়ে চলে গেছে আনমনে ধুলোমাটির পথ অজানার ঠিকানায়। সেই মেঠোপথ ও গোমতী নদী কোথায় যে চলে গেছে, এদের গন্তব্যের ঠিকানা আমার কাছে রহস্যপুরীর মত মনে হত। মাঠের কাছ দিয়ে কোমর বাঁকিয়ে নদী গোমতীও চলেছে কখনও কলধ্বনি করে কখনো নম্রশ্রোতে। গোমতীর বুকে নৌকোতে বা ডিঙ্গিতে চড়ে কত লোক আসে যায় । আমার আপন পৃথিবীর মানচিত্রে সেই আধা শহুরে আধা গ্রাম্য পরিবেশের বর্ধিষ্ণু মুরাদনগর আমার জন্মস্থান নাহলেও দ্বিতীয় জন্মভুমির মত। মুরাদনগর আর আমি কোথাও যেন এক হয়ে আছি। নিজের মাবাবা ভাইবোন আত্মীয়স্বজনের বাইরেও যে অচেনা অজানা কোনো মানুষের সাথে পরম সখ্যতা হয় তা আমার প্রথম ঘটেছে মুরাদ নগরেই। সেই ধুসর মেঠোপথ ধরে অনেক বালক-বালিকারা সদরের এই পাঠশালায় পড়তে আসতো। যেদিন পরিপাটি হয়ে প্রথম স্কুলে গেলাম সেদিনই অজানা অচেনা এক বালিকা আমাকে কেবল দেখে আড়চোখে। দুখানা ঝুটি বেঁধে দিয়েছিলেন আম্মা আমার মাথার মধ্যখান দিয়ে সিথি কেটে। বালিকা আমার চুলের ঝুটি দেখে, গায়ের জামাকাপড়, পায়ের স্যান্ডেলও দেখে। তারপর এক সময় ব্রেঞ্চে আমার পাশেই আসন পাতে নিজে বসার। সাবেরা তার নাম। আমার প্রথম সখি, বাল্যসখি। গোমতীর তীর ঘেঁষে যে মেঠোপথ সেই পথ ধরেই সে প্রতিদিন স্কুলে আসে আর ছুটির ঘন্টি পড়লে একই পথে মিলিয়ে যায়। ক্রমে আমরা দুজন হরিহর আত্মা হয়ে যাই। সাবের এখন দেখতে কেমন হয়েছ?  আমি কি কোনোদিন তার সাথে দেখা হলে চিনতে পারব তাকে, বা সে কি প্রথম দর্শনেই চিনবে আমাকে?  মনে হয়না। সাবেরা কোথায় আছে, কোন সে দূরের গ্রামে বা অজানা শহরে সাবেরা বাস করে আমার কিছুই জানা নাই, সেও জানেনা আমি কোথায়। আমাদের দুজনের ঠিকানা এখন দুই দিগন্তে।আমাদের মধ্যখানে যেন তেপান্তরের কালান্তক মাঠ। সময়ের এই মাঠ পাড়ি দেওয়া যায়না। আমার ছেলেটা পদার্থ বিজ্ঞানের খুব ভক্ত, এই সাবজেক্ট নিয়ে সে পড়শোনাও করছে। সেই ছোট্ট থাকতেই সে বলতো, মা,  টাইমমেশিন আবিষ্কার হলে মানুষ অতীত ও ভবিষ্যত ভ্রমণ করবে একদিন। আজগুবি কথা। আমি পদার্থবিজ্ঞান বুঝিনা। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে টাইমমেশিনে করে মেয়েবেলাটা দেখতে যাই, কিশোরীকালটা ভ্রমণ করে আসি। সাবেরাকে দেখে আসি। আবার মুরাদনগর সদরের পাঠশালায় যাই। ---চলবে

গুলজাহান রুমী
অটোয়া, কানাডা।


Share:

আরও পড়তে পারেন

Comments

John Doe: Great article!

Jane Smith: Loved this story.