ফোনটা বেজে উঠতে মৌ কাজ করতে করতে ফোন উঠিয়ে গম্ভীর গলায় বলে--- হ্যালো।
---ক্যান আই স্পিক উইথ মৌটুসি ইসলাম?
হয়েছে কাজ! মনে মনে বলে মৌ। নিশ্চয় টেলিমার্কেটার! এদের পাল্লায় একবার পড়লেই হয়, আধাটা ঘণ্টা তার নষ্ট হবে।
তাই সে খুব সতর্কভাবে বলে--- স্পিকিং।
অপরপ্রান্ত থেকে এবারে বাংলা কথা ভেসে আসে--- মৌ, কেমন আছ?
মৌ অকুল পাথারে পড়ে গেল। সে একটু অন্যমনস্ক ধরণের মানুষ। তার উপরে কাজে ব্যস্ত থাকায় গলার স্বরটাও খেয়াল করা হয়ে ওঠেনি। যা মনে হচ্ছে পরিচিত কেউ হবে। কিন্তু মৌ তাকে চিনতে পারছেনা। এই একটা কারণে সে যে কতবার অপ্রস্তুত হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবেনা। কিছুদিন আগে এক বন্ধুকে নিজের চাচাতো ভাই মনে করে যে দাবড়ানিটা খেল সে।
কিছুক্ষণ বাদে ফের অপরপ্রান্ত থেকে গলা পাওয়া গেল--- মৌ, আমি আয়াজ।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মৌ। যাক বাবা, অল্পের উপর দিয়ে গেল। তাকে আর নাম হাতড়ে মরতে হবেনা। তার কলেজের বন্ধু আয়াজ ফোন করেছে।
উচ্ছ্বসিত হয়ে তাই সে বলে--- আয়াজ, কেমন আছ?
কিন্তু আয়াজ তার উচ্ছ্বাসের মুখে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে ধমকে ওঠে--- তোমার কি হয় বলতো? এমনভাবে চুপ করে যাও কেন?
অপ্রস্তুতুভাব ঢাকবার জন্য মৌ রাগ দেখিয়ে বলে--- চুপ করে যাবনা? আয়াজ, তুমি ছয় মাসে নয় মাসে একবার করে ফোন করবে আর আশা করবে যে আমি শোনামাত্র তোমার গলা চিনে যাব। খুবি অন্যায় কিন্তু!
হাসতে হাসতে আয়াজ এবারে বলে--- আচ্ছা, হয়েছে হয়েছে। আমি তোমাকে একটা কারণে ফোন করেছি।
--- সে আমি জানি। কারণ ছাড়া ফোন করার বান্দা তুমি না। তো শুনি কি কারণ।
--- আকরাম এসেছে কয়েকদিনের জন্য। একটা কনফারেন্স এটেন্ড করতে।
আয়াজের কথার মাঝেই মৌ বলে বসে--- আকরাম এসেছে? এ তো খুবি খুশির খবর। ওর সাথে আমার শেষ দেখা কবে হয়েছে সেটাই তো আমি মনে করতে পারছিনা। বিশ বছরের বেশি হবে নিশ্চয়।
--- হুম। সেজন্য ভাবছি যে চলো কোথাও একসাথে বসি। একটা আড্ডা হয়ে যাক।
--- বেশ তো। খুবি ভালো হয়। কোথায় কখন আমাকে জানিও। আমি সময়মত গিয়ে হাজির হব।
--- নাও, কথা বল আকরামের সাথে। ও আমার সাথে আছে এখন।
আকরাম ফোন ধরে হ্যালো বলতেই মৌয়ের মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হল। বলে--- আকরাম, কেমন আছ? কত বছর পরে বল তো?
--- আমি ভালো আছি। বহুবছর পর। তুমি তো কলেজ শেষ হওয়া মাত্র একেবারে লাপাত্তা হয়ে গেলে।
--- কই লাপাত্তা হলাম? আয়াজের সাথে আমার ইদানিং যোগাযোগ হয়েছে। মানে তিনি ছয়মাসে নয় মাসে আমাকে কৃপা করে ফোন দেন আরকি!
--- বাহ! তুমি তো দেখি অনেক কথা বল এখন, মৌ। কলেজে তো কথাই বলতে না।
মৌ হাসতে হাসতে জবাব দেয়--- তো সারাজীবন মুখচোরা হয়ে থাকলে চলবে? সেজন্য এখন সুদে আসলে কথার কোটা পুরা করছি। আমার কথা থাক। তোমার খোঁজ পেয়ে কি যে ভালো লাগছে। তোমার খবর বল। কোথায় আছ এখন? বউ বাচ্চার খবর কি?
--- আমি থাকি অস্ট্রেলিয়াতে। ২০০১ সালে গেছি। এখন ওখানে সেটেল্ড।
--- আর বউ বাচ্চা?
কিছুক্ষণ চুপ থাকে আকরাম। তারপরে ধীরে ধীরে বলে-
--- বউ-বাচ্চা নাই।
--- কি বল? আমি তোমার বিয়ের খবর পেয়েছিলাম কিন্তু।
--- আই এম ইন দা মিডল অফ গেটিং এ ডিভোর্স।
মৌ একটা ধাক্কা খায়। ছিঃ ছিঃ। না জেনেই সে মনে হয় আকরামের মনে ব্যথা দিয়ে ফেলল।
তাই তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে বলে--- তাহলে কি প্ল্যান? তোমার সাথে কখন দেখা হচ্ছে? মানে তুমি ফ্রি আছো কখন?
--- সেটা আমি আয়াজের উপরে ছেড়ে দিয়েছি। ও কোথায় জানি ব্যবস্থা করছে। আমি কাল পর্যন্ত কনফারেন্স নিয়ে ব্যস্ত থাকব। শনিবারটা আছি। হয়ত শনিবারই বেস্ট অপশন হবে।
--- শনিবার হলে আমার জন্যও ভালো হয়। যাহোক, তোমরা ঠিকঠাক করে আমাকে জানিও, আমি চলে আসব।
--- ঠিক আছে। দেখা হবে তাহলে, মৌ।
--- খোদা হাফেজ, আকরাম।
শনিবার রাতে নির্দিস্ট রেস্তোরায় ঢুকে দেখে আয়াজ আর আকরাম তার আগেই সেখানে পৌঁছে গেছে। একে অপরকে দেখে তিনজনের মুখে বিশাল বিশাল হাসি দেখা গেল, বয়স যেন এক লহমায় ২০ বছর কমে গেল। তুমুল আড্ডা হল। বন্ধুরা কে কোথায় আছে, কি করছে, কারা দেশে বেশ গুছিয়ে বসেছে, কারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে, কারা ডুমুরের ফুল হয়ে গেছে--- তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা, সব খবর একে একে বেরুতে লাগল। কলেজ জীবনের অসংখ্য ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে অনেক হাসাহাসি চলল। কলেজের কম কথা বলা, গম্ভীর মৌকে এত কথা বলতে দেখে বাকি দুজন খেপিয়ে খেপিয়ে তার দফারফা করে দিল। মৌ হাসিমুখে ওদের টিকা টিপ্পনী উপভোগ করল, বিন্দুমাত্র গায়ে মাখল না। করুক কত করবে! কলেজে যাদের সাথে খুব বেশি কথা কখনো হয়নি, তাদেরকে আজ যেন খুব আপন আপন লাগছে। ওরা যেন তার হারিয়ে যাওয়া স্বত্বার একটা সাক্ষী। নাম না জানা এক আবেগে মৌয়ের হৃৎপিণ্ড আজ ফেটে পড়তে চায়।
কথার ফাঁকে একসময়ে সে স্পষ্ট টের পায় যে তাদের মাঝে বিশাল এসে বসেছে। বিশালকে মৌ দেখতে পাচ্ছেনা কিন্তু তার উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। এক হাজার ভোল্টের শক খেয়ে সোজা হয়ে বসল সে। চেঁচিয়ে উঠতে গেল--- বিশাল, তুমি এখানে?
পরমুহূর্তে নিজেকে সামলিয়ে নেয় মৌ। সে যা টের পায়, সবাই কি সেটা বুঝতে পারবে? তাদের মৃত সহপাঠী বিশাল, যে প্রচণ্ড ব্রিলিয়ান্ট হওয়া সত্ত্বেও ভুল রাস্তায় চলতে গিয়ে অসময়ে নিজের জীবনটা খুইয়ে বসল--- সে যে তাদের মাঝে এসে বসেছে, একথা বলতে গেলে ওরা দুজন তাকে পাগল ঠাউরাবে। তার চেয়ে এই ভালো। বিশাল নীরবে তাদের আড্ডায় অংশ নিক।
মৌ আয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে। বিশ বছর আগের সেই প্রবল আত্মবিশ্বাসী, কিছুটা অহংকারী ছেলের চোখে আজ গভীর বেদনার ছায়া। শুনেছে আয়াজের বিয়ে ভাঙব ভাঙব করছে। কি বৃত্তান্ত, কার দোষ মৌ কিছু জানেনা, জানতে চায়ও না। শুধু জানে যে বন্ধুর জন্য তার অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। কলেজে থাকতে যে মেয়েটির সাথে আয়াজের দীর্ঘদিনের প্রেম ছিল, তাকে সে হারিয়েছে নিজের গোঁয়ার্তুমির জন্য। এখন দুজনেই বিবাহিত কিন্তু দুজনেই অসুখী। কেন এমন হয়? এত ছোট জীবনে অপ্রাপ্তি এত বেশি কেন?
আকরামের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে মৌ। আকরাম কি এখনো তাকে ভালোবাসে? একসময় তো বাসতো। কিন্তু মৌ ক্লাসমেটের সাথে প্রেম করবে না এই অজুহাত দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। যদিও বন্ধুত্বটা কলেজের শেষ দিন অবধি বজায় ছিল। আর আকরাম একবারের বেশি সে প্রসঙ্গ আর তোলেনি। কিন্তু আজ যেন সে আকরামের চোখে নীরব অভিমান দেখতে পাচ্ছে।
আর সে নিজে? এই বিশটা বছর সে হাজারবার ক্ষত বিক্ষত হয়েছে। কিন্তু কি এক জেদে যে সে বিয়েটা টিকিয়ে রেখেছে সে নিজেও মাঝে মাঝে বুঝতে পারেনা। হয়ত বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়াকে সে জীবনের পরীক্ষায় ফেল করার সামিল বলে মনে করে তাই। স্কুল কলেজের তুখোড় ছাত্রী, যে কখনো প্রথম ছেড়ে দ্বিতীয় হয়নি--- সেই মৌ আজ জীবনের পরীক্ষায় পাশ করতে পারবে না, তার অহংবোধ হয়ত তা নিতে পারবেনা বলেই বলেই সে বিশটি বছর ধরে কাঁটাবনের মধ্য দিয়ে খালিপায়ে হেটে রক্তাক্ত হয়েছে।
মৌয়ের প্রচন্ড ইচ্ছা করে দুই হাত বাড়িয়ে দুই বন্ধুর হাত ধরে বলে--- তোমাদেরকে আমি খুব ভালোবাসি।
কথাটা তো মিথ্যা নয়। ভালোবাসার কি একটাই রূপ? তারা এখন সবাই পরিণত বয়সে পৌঁছে গেছে। একথা তো বলাই যায়।
কিন্তু নিজেকে সংযত করে মৌ। বন্ধুদের চোখে সে এখনো কলেজের সেই মৌ রয়ে গেছে--- রিজার্ভড, স্বল্পভাষী, মুডি। তাকে হঠাৎ করে এমন স্বভাববহির্ভূত আচরণ করতে দেখলে ওরা আশ্চর্য হয়ে যাবে। তাকে প্রগলভ ভাববে। ইচ্ছা হলেই কি সবকিছু করা যায়?
মৌয়ের চোখে একঝলক পানি এসে পড়ে। সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অশ্রু গোপন করবার চেষ্টা করে। মনের কথা মুখে আনা এত কঠিন কেন? (সমাপ্ত)
তাবাসসুম নাজ
টরোন্ট, কানাডা।
ভালোবাসার আরেক নাম--- তাবাসসুম নাজ
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ May 4, 2019 |
দেখা হয়েছে : 1686
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.