দিনে দিনে আমি ছোট্ট থেকে ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছি। আমার শিরা-উপশিরায় একটি কোষ ও আর বেঁচে নেই…! শুধু এই দীর্ঘশ্বাসটুকুই…! সবার মৃত্যু হলেও পৃথিবীতে দীর্ঘশ্বাসের যে কোন মরন নেই… আর তাই ই হয়তো…? বিশেষ কিছু নয়… রাস্তার পাশে অখ্যাত এক বংশে জন্ম ছিলো আমার…।
বেশ মনে পড়ে সে দিনটা। টগবগে এক তরুণ উনি তখন। বার দুয়েক হাঁটলেন ছোট রাস্তাটির এ প্রান্ত ও প্রান্ত। চোখে-মুখে শঙ্কা আর প্রতীক্ষার মাখামাখিতে কেমন এক অস্হিরতা সারা অবয়বে। হঠাৎ কি মনে করে উনি তুলে নিলেন আমাকে। একটু পরেই ও প্রান্ত থেকে তিনি আসলেন। হাতে দুটো বই আর একটি খাতা। তার আগমনে যেন আরও মহিমান্বিত হয়ে উঠলো শেষ বিকেলের রোদ। ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন উনি। দু’একটি কথা, তারপর উনি আমাকে বাড়িয়ে দিলেন তার দিকে। তিনি নিলেন…! আনন্দে মূর্ছা যাওয়ার মতো উপক্রম হলো আমার! দুপাশের নীরব নিসর্গ যেন মুখর হয়ে উঠলো করতালিতে। কিন্তু মূহুর্ত পরেই যে পাল্টে গেলো সবটা পৃথিবী? তিনি সজোরে ছুঁড়ে ফেললেন আমাকে মাটিতে…! আমার প্রাণ যেনো যায় যায় অবস্হা। কিন্তু সেদিকে আমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই…! আমি দেখলাম একটা গোটা জীবনের শূন্যতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এক জোড়া অসহায় চোখ…! আর একজন পাশ কাটিয়ে বেড়িয়ে গেলেন দ্রুত। একটা নীরব আর্তনাদ যেন সংগী হলো মহাকালের…! আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম আমার ক্ষুদ্র জীবনের পরিনতি! কিন্তু কি আশ্চর্য…! এক অবশ বিহ্বলতার রেশ কাটিয়ে পরম মমতায় উনি আমাকে তুলে নিলেন জামার বুক পকেটে। দুদিন ছিলাম সেখানে আমি। তারপর থেকেই জীবনানন্দের এই সম্ভারের মধ্যে আমার বাস। তাঁর অন্ধকার কবিতাটির পাতায় আমার বিছানা । নাহ্... এ নিয়ে আমার কোন ক্ষোভ নেই…! সেই দিন থেকে এই এতোটা বছর আমি চিনেছি ওনাকে। আমি জানিনা সেই তরুণী এখন কোথায় কেমন আছেন? আমার শরীরে তো এখন আর কোন গন্ধ নেই…! তারপরও প্রতি রাতে ঘুমোতে যাবার আগে, একবার যখন উনি বইয়ের পাতা খুলে আমাকে কাছাকাছি এনে শ্বাস নেন, তার দীর্ঘশ্বাসটুকু আমি পড়ে নেই…! জানিনা আর কতোদিন…! একটা পোড়া মন যেমন টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ে সময়ের আনাচে-কানাচে… আমার প্রাণহীন এই ছোট্ট দেহখানিও যে তেমনি একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে নিয়ত…! কোন নামকরা বংশের প্রজন্ম আমি নই। পৃথিবীর কাননে প্রতিদিন আমার মতো লক্ষ কোটি ফুল ফোঁটে আর অযত্নে ঝরে যায়। আমার নামও হয়তো এখন আর কেউ বলতে পারবে না। সে নিয়েও আমার কোন আক্ষেপ নেই…! আমি ক্ষয়ে যাবো বেনামেই… কিন্তু তার আগে কেউ যদি আমাকে একবার বলতে পারো… কি নাম এই ভালোবাসার…?
আমি প্রকৃতির কাছে ভিক্ষে চাইবো আমার সুগন্ধিটুকু আবার ফিরিয়ে দিতে…!!
ফরিদ তালুকদার। টরন্টো, কানাডা
আমার কথা – ফরিদ তালুকদার
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ April 18, 2020 |
দেখা হয়েছে : 1023
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.