অটোয়া, রবিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

প্রতীক্ষা – যুথিকা বড়ুয়া

By Ashram | প্রকাশের তারিখ February 19, 2020 | দেখা হয়েছে : 1467
প্রতীক্ষা – যুথিকা বড়ুয়া

(১)
ঠাৎ ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙ্গে যায় মমতার। তন্দ্রা জড়ানো চোখে ধড়্ফড়্ করে ওঠে। বুক ধুক্ ধুক্ করছে। র্থ র্থ করে কাঁপছে সারাশরীর। ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে হাঁপাচ্ছে। মুহূর্তের জন্য ঠাহর করতে পাচ্ছিল না, স্বপ্ন না বাস্তব। ঘুমের ঘোর কেটে যেতেই চোখ মেলে দ্যাখে চারিদিকে। তখনও আবছা অন্ধকার বাইরে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্যাখে,  ভোর পৌনে পাঁচটা বাজে। দিগন্তের পূর্ব প্রান্তর জুড়ে ঊষার প্রথম স্নিগ্ধ, নির্মল, কোমল ক্ষীণ আলোর আভায় ক্রমশ একটু একটু করে লাল হয়ে উঠছে। চারদিক নীরব, নিস্তব্ধ।

পিছন ফিরতেই দ্যাখে, খোকনের ঘরের দরজা খোলা। ভিতরে আলো জ্বলছে। বাথ্রুমে ঝির ঝির করে পাইপকলের জল পড়ছে শোনা হচ্ছে।-খোকা স্নান করছে বোধহয়। কিন্তু এতো ভোরে! খোকা আজ যাচ্ছে কোথায়! 
স্বগতোক্তি করতে করতে বিছানা ছেড়ে নেমে আসে মমতা। অবিলম্বে গিয়ে ঢোকে খোকনের ঘরে। ঢুকেই নজরে পড়ে, ওর বিছানার পাশে টেবিল ল্যাম্পের আড়ালে কালো রঙের একটি কাপড়ের পোটলা পড়ে আছে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, কোনো জন্তু-জানোয়ার জানালা দিয়ে ঢুকে টেবিল ল্যাম্পের পাশে ঘুপচি মেরে বসে আছে।

খানিকটা বিস্ময় নিয়ে মমতা কাছে এগিয়ে যায়। গিয়ে দ্যাখে, কোনো জীব-জন্তু নয়, কাপড়ের পোটলাও নয়। সেটি মাঝারি আকারের একটি ল্যাদারের ব্যাগ। ব্যাগটি বাইরে থেকে ফুলে উঠেছে। মনে হচ্ছে, ব্যাগ ভর্তি কোনো জিনিস আছে। কিন্তু কি হতে পারে! আশ্চর্য্য, খোকার ঘরে এতবড় ল্যাদারের ব্যাগ এলো কোত্থেকে! কখনো তো দেখিনি। মনে মনে বলল মমতা। 

স্বাভাবিক কারণে ব্যাগটি খুলে দেখবার বড্ড কৌতূহল জাগে মমতার। সম্বরণ করতে পারে না। কিন্তু ব্যাগটি ধরতে যেতেই চাপা আর্ত কণ্ঠে গর্জে ওঠে খোকন,-‘মা, তুমি এঘরে? কি করছ ওখানে? সর্বণাশ, ব্যাগে হাত দিওনা। শীগ্গির রেখে দাও।’ মনে মনে বলে,-ঠিক এই ভয়ই করেছিলাম। বলতে বলতে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বাথরুম থেকে দ্রæত বেরিয়ে আসে খোকন। চোখেমুখে বিরক্তি প্রকাশ করে একরকম ছোঁ মেরে মায়ের হাত থেকে ব্যাগটি কেড়ে নেয়। এদিক ওদিকে দেখে ব্যাগটি হাইড করে বলে,-‘যাও, যাও, গিয়ে শুয়ে পড়ো যাও।’

অপ্রস্তুত মমতা হঠাৎ থতমত খেয়ে গেল। আচমকা খোকনের এধরণের বিহেইব, অস্বাভাবিক অস্থিরতা লক্ষ্য করে স্তম্ভিত হয়ে যায় বিস্ময়ে। ওর আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে হাঁ করে চেয়ে থাকে। ও’যে কিছু একটা লুকোচ্ছে, সেটা দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত হয়। কিন্তু সহজ সরল মমতা আদৌ অনুমেয় হচ্ছে না যে, ঐ ব্যাগটিতে কি আছে! মায়ের অজান্তে খোকন আজ কোথায় যাচ্ছে, আর সেই সর্বণাশা জিনিসটাই বা কি!
মায়ের বিবর্ণ চেহারা লক্ষ্য করে স্বাভাবিক হয়ে খোকন বলল,-‘আরে বাবা আজ আমাদের ইউনিভার্সিটিতে জরুরী মিটিং আছে। সবাইকে আর্লি মর্নিং এ এ্যাটেন্ড্ করতে হবে। তুমি যাও, গড়িয়ে নাও কিছুক্ষণ।’

এমন স্বাভাবিক গলায় বলল, যেন কিছু হয়নি। এদিকে মনে মনে বলে, মা নিশ্চয়ই টের পেয়ে গেছে। 

নজর এড়ায় না মমতার। লক্ষ্য করে, খোকনের ঔদাসীন্যতা। অমনযোগীতা। কি যেন ভাবছে। খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে ওকে। 
এমতবস্থায় একজন গর্ভধারিনী মায়ের মন স্বস্তি পায়না। চিন্তায় পড়ে যায় মমতা। কারণ অনুসন্ধানে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় খোকনের মুখের দিকে পলকহীন নেত্রে চেয়ে থাকে। 

চোখে চোখ পড়তেই অস্ফূট হেসে ফেলল খোকন। বলল,-‘খামাখা টেনশন নিচ্ছো মা। বলছি এক্ষুণি বেরতে হবে, মিটিং আছে!’

মায়ের সাথে খোকন কথা বলছে ঠিকই কিন্তু ওর ধ্যান অন্য দিকে। মনে হচ্ছে, মাকে এঘর থেকে ভাগাতে  পারলে ও’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। 

খট্কা লাগে মমতার। সন্দেহজনক মনে হয়। অসন্তোষ গলায় বলল,-‘খোকা, আমার মাথার দিব্যি দিয়ে বল্তো, এই সাতসকালে তুই কোন্ রাজকার্যে যাচ্ছিস শুনি! কিসের মিটিং তোদের?’

বিরক্তি প্রকাশ করে খোকন বলল,-‘ওফঃ হো, কি মুশকিল, বলছি গিয়ে শুয়ে পড়তে! যাও তো, যাও। ওসব তুমি বুঝবে না।’

নরম হয়ে মমতা বলল,-‘মায়ের কাছে কিছু লুকোস নে বাবা। কোথায় যাচ্ছিস, কি করছিস, মাকে বলবি নে! তুই ছাড়া মায়ের আর কে আছে বল! হ্যাঁ রে, ঐ কালো ব্যাগের মধ্যে কি আছে রে! খুব দামী জিনিস বুঝি!’ 

খোকন নিরুত্তর। পড়ে যায় বিপাকে। মায়ের জেরায় একবার পড়ে গেলে আর রক্ষে নেই। জবাবদিহী করতে করতে আজকের প্ল্যান-প্রোগ্রাম সব যাবে মাটি হয়ে। এইভেবে মাকে উপেক্ষা করে খোকন হঠাৎ আহাল্লাদে গদগদ হয়ে ওঠে। বাধ্যগত ছেলের মতো মার্জিত হয়ে বলল,-‘এতো ভাবনার কি আছে মা! আমি কি দুধের খোকা! ওটা আমার এক বন্ধুর। কয়েকদিনের জন্য গচ্ছিত রেখেছে।’ 
হাতের মাশেল ফুলিয়ে বলে,-‘ইউনিভার্সিটির ছাত্র আমি, হাট্টা গোট্টা তরুণ যুবক। একটা তুচ্ছ বিষয়কে এতো সিরিয়াসভাবে কেন নিচ্ছো বলো তো! আমারও তো একটা প্রাইভেসি আছে, না কি!’

ভ্রু-যুগল উত্তোলণ করে চেয়ে থাকে মমতা। চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে। কিছু বলার ব্যাকুলতায় ঠোঁটদু’টো কেঁপে উঠতেই মাকে জড়িয়ে ধরে খোকন। সহাস্যে বলে,-‘রিল্যাক্স মাদার রিল্যাক্স,ডোন্ট ওরি। চটে যাচ্ছো কেন? ক’মন! আচ্ছা, উঠেই এলে যখন শীগগির এককাপ গরমাগরম চা করে নিয়ে এসো দেখি। শরীরটা একটু ঝর ঝরে হয়ে যাক!’
কথা না বাড়িয়ে মমতা দ্রæত চলে যায় কিচেনরুমে। ইত্যবসরে খোকন চটপট জামা-প্যান্ট পড়ে নেয়। মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে কিচেনরুমের দিকে গলা টেনে দ্যাখে। মমতা পিছন ফিরতেই টি -টেবিলের নিচ থেকে ল্যাদারের ব্যাগটি হাতে নিয়ে চুপিুচপি নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল খোকন। 

পরক্ষণেই প্লেটে করে চা, বিস্কুট নিয়ে আসে মমতা। ঘরে ঢুকে দ্যাখে, খোকন ঘরে নেই। বাথ্রুমে গলা টেনে দেখলো, সেখানেও নেই। মায়ের অগোচরে কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে খোকন, টের পায়নি। হঠাৎ নজরে পড়ে, টি-টেবিলের নিচে কালো ব্যাগটিও নেই। 

মমতা তৎক্ষণাৎ চাপা উত্তেজনায় স্বগতোক্তি করে ওঠে,-‘আশ্চর্য্য, খোকা আজ দানাপানি মুখে না দিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, এতো জরুরী মিটিং! মাকে একবার দর্শণ দিয়ে গেল না! কিন্তু মিটিংএর দোহাই দিয়ে কালো ব্যাগে করে খোকা কি নিয়ে গেল? কোথায় নিয়ে গেল?’
হাজার প্রশ্নের ভীঁড় জমে ওঠে মমতার। দুঃশ্চিন্তা-দুর্ভাবনায় ক্রমশ আষ্টে-পিষ্ঠে ঘিরে ধরে। এক মুহূর্তও স্বস্তি পায়না। অজানা আশক্সক্ষায় বুক ধুক্ ধুক্ করে ওঠে। প্রচন্ড উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় মমতার অতিবাহিত হতে থাকে এক একটা মুহূর্ত। 

 

(২)
ছোটবেলা থেকেই খোকন একরোখা। অনমনীয় জেদ। বিরল সেন্টিমেন্টাল। তন্মধ্যে শর্ট টেম্পার। প্রতিটা বিষয়েই ওর বিরোধীতা, আপত্তি, অভিযোগ। প্রখর সংগ্রামী মনোভাব। যেদিন শহরের রাজপথে প্রথম ভাষা আন্দোলনের শুরুতে নবীন সদস্য আবদুল রশীদ বেকায়দায় পাকবাহিনীর কবলে পড়ে নির্মমভাবে আত্মাহুতি দিয়েছিল তাদেরই বন্দুকের গুলী বিদ্ধ হয়ে। আর সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা সমগ্র জনগণের মনে বৈপ্লবিক চেতনার সাংঘাতিক বিস্ফোরণ ঘটে। সেই বৈপ্লবিক চেতনার বাতাবরণে খোকন আরো গভীরভাবে স্বাধীনতা বিপ্লবের সাথে আষ্টে-পিষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। লোকের কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে,-‘ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য উজ্জ্বল চৌধুরী (ওরফে খোকন) একজন বিপ্লববাদী স্বদেশী।’

তবু কখনও মনের মধ্যে তেমনভাবে কোনো ভাবনার উদয় হয়নি মমতার। বরং গর্ববোধ করে। আত্মগর্ভে ওর বুক ভরে ওঠে। ভাবে, স্বদেশী মানেই দেশকে ভালোবাসা, দেশের জনগণকে ভালোবাসা, দেশের সেবা করা, দশের সেবা করা, জনগণের সেবা করা। এ তো মহৎ কাজ, মহা পূণ্যের কাজ। কিন্তু খোকা আজ কোণ্ কার্যালয়ে গেছে? কিসের পূর্ণ অর্জন করতে গেছে?

বেলা দশটা বাজে। মমতা তখনও অশান্ত, উদ্বেলিত। ভোরের দুঃস্বপ্নের প্রতিঃচ্ছবি ওর স্নায়ূকোষে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো জীবন্ত হয়ে মনঃশ্চক্ষে ভেসে উঠছে। তন্মধ্যে খোকনের আকস্মিক ব্যতিক্রম চাল-চলন, কথাবার্তা, বিবর্তন চেহারায় মনের মধ্যে সন্দেহের দানা চাড়া দিয়ে ওঠে। অজানা আশক্সক্ষায় ঘিরে ধরে। সন্দেহ ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকে। প্রচন্ড ভাবিয়ে তোলে। নদীর ঢেউএর মতো মস্তিস্কের কোষে কোষে বার বার একই প্রশ্ন ফিরে এসে আঘাত করতে থাকে,-মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে, সম্পূর্ণ উপবাসে খোকা আজ গেল কোথায়?

সকাল থেকে চা-জল-খাবার নিয়ে বসে আছে মমতা। মুখেই ঢুকছে না। ক্ষিদে, তৃষ্ণাও ভুলে গেছে। কে যেন একটানা দরজা নক্ করছে, এতক্ষণ খেয়ালই ছিলনা। হঠাৎ জানালার ধারে বসে থাকা হুলো বিড়ালটা মিঁয়াউ করে ডাক দিতেই চমকে ওঠে। ভাবলো, খোকা ফিরে এসেছে।  

দৌড়ে যায় মমতা। দরজা খুলে দ্যাখে, একটি অচেনা যুবতী মেয়ে উদ্ভ্রান্ত  হয়ে দরজার ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে  হাঁপাচ্ছে। কিছু বলবার ব্যাকুলতায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে।

হঠাৎ অপরিচিত মেয়েটিকে দেখে ঘাবড়ে যায় মমতা। কিছু বুঝে ওঠার আগে হাঁপাতে হাঁপাতে মেয়েটি বলল, -‘মাসিমা, আমি অলকা, উজ্জ্বলের ক্লাসমেট্। কিছুক্ষণ আগে রেললাইন ধরে ওকে যেতে দেখলাম। গায়ে চাদর জড়ানো, পায়ে হাওয়াই চপ্পল। খুব জোরে হেঁটে যাচ্ছিল। ও’ কোথায় গেল আপনি জানেন?’

অষ্ফূট স্বরে মমতা বলল,-‘তা তো জানি নে। বলছিল, ইউনিভার্সিটিতে যাবে। জরুরী মিটিং আছে। কিন্তু যাবার সময়...!’

মমতার কথা শেষ না হতেই আঁতকে ওঠে অলকা।-‘কি বলেন, ইউনিভার্সিটিতে গেছে!’
ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে অলকা। কিছুক্ষণ থেমে বলল,-‘সর্বণাশ, আজ ওকে ঘর থেকে বের হতে দিলেন কেন?’ বলে সিঁড়িতেই ধপাস করে বসে পড়ে।

ব্যস, পড়লো মরার উপর খাড়া। চিন্তাধারার গতিবেগ আরো তিনগুণ বেড়ে যায় মমতার। বুক ধুক্ধুক্ করে। চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, মনে বিভীষিকা। হঠাৎ কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে আর্তনাদ করে ওঠে,-‘কার কি সর্বণাশ হবে মা! আমি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি নে!’

অসন্তোষ গলায় অলকা বলল,-‘কেন, খবরে কিছু শোনেন নি? আজ ইউনিভার্সিটির চারপাশে সরকার এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে। নোটিশ ঠুকে দিয়েছে, ইউনিভার্সিটির ত্রিসীমানায় কোনো মিটিং, মিছিল করা চলবে না। আজ একটা গন্ডোগোল হবার খুব সম্ভাবনা আছে!’

শুনে কেঁপে ওঠে মমতা। কম্পিত স্বরে বলে,-‘এ্যাঁ! এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে, গন্ডোগোল হবে। কিন্তু কেন?’

বিস্মিত কণ্ঠে অলকা বলল,-‘সেকি মাসিমা, উজ্জ্বল কিছু বলেনি আপনাকে? আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা করবার দাবিতে ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা একজোট হবে, আন্দোলন করবে আপনি জানেন না? আজ ওরা এক’শ চুয়াল্লিশ ধারা লঙ্ঘন করে, হাতে ঝান্ডা নিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে এসেম্বেলীর দিকে যাবে। পুলিশ নিশ্চয়ই ওদের উপর হামলা করবে, লাঠিচার্জ করবে, কাঁদানি গ্যাস ছুড়বে। ব্যস, শুরু হবে ঘোরতরো গন্ডোগোল।’

ভয়-ভীতিতে বুক শুকিয়ে যাচ্ছে মমতার। অসহায় চোখের চাহনি। কণ্ঠে হতাশার সুর। শুকনো একটা ঢোক গিলে বলল,-‘হ্যাঁ, শুনেছিলাম তো! কিন্তু এতোখানি বাড়াবাড়ি হবে ভাবিনি। কি হবে এখন বলো তো!’

মমতার মানসিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করে শান্তনা দেবার চেষ্টা করে অলকা। বলল,‘আপনি অযথা ভেঙ্গে পড়ছেন মাসিমা। উজ্জ্বল বিদ্যান, বুদ্ধিমান, চালাক চতুর ছেলে। গায়ে আঁচ পড়তে দেবে না। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি খবর নিয়ে!’

অলকা চলে যেতেই ভারাক্রান্ত মনটা একটু হাল্কা হয় মমতার। চিন্তা-ভাবনাও কিছুটা দূরীভূত হয়। মানসিক অবসন্নতা ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যথারীতি ফিরে যায় নিজের কাজে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খটকা লাগছে। কোথায় যেন হৈ চৈ হচ্ছে, চিৎকার চেঁচামিচি হচ্ছে। মমতা কান পেতে শোনে। কিন্তু শব্দটা মুহুর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। 
-‘দূর্গা, দূর্গা! সবই মায়ের ইচ্ছা!’ আপন মনে বির বির করতে করতে ঢুকে পড়ে ঠাকুরঘরে। 

 (৩)
সকাল ন’’টা বাজে প্রায়। খোকন দূর থেকে লক্ষ্য করে, পূর্ব পরিকল্পিত অনুযায়ী ছাত্ররা তখনও এসে পৌঁছায় নি। ইউনিভার্সিটির চারিদিকে পুলিশ পাহাড়া দিচ্ছে। কিন্তু শ্লোগান শোনা যাচ্ছে,-‘রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা চাই, বাংলা চাই!’ 

খোকন চেষ্টা করে ইউনিভার্সিটির পিছনের গেট দিয়ে ঢুকতে। কিন্তু উপায় নেই। সেখানেও পুলিশ দাঁড়িয়ে, হাতে বন্দুক নিয়ে পাহাড়া দিচ্ছে। ততক্ষণে ছাত্ররা সব দলবেঁধে মিছিল করতে করতে ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের প্রাঙ্গনে চলে আসে। পুলিশ তক্ষুণি ওদের উপর হামলা চালায়, লাঠিচার্জ করে। কয়েকজনকে জামার কলার ধরে জবরদস্তী তুলে নেয় গাড়িতে। তখনই শুরু হয় হট্টোগোল, ভাগ-দৌড়, বিরূপ বিশৃঙ্খল পরিবেশ। খোকন ছুটে এসে চাদরের ভিতর থেকে এলোপাথারী ছুঁড়তে থাকে বারুদের গোলা। ইতিপূর্বে কয়েকজন ছাত্র পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় পুলিশের ভ্যান। অন্যদিকে উত্তেজিত জনসমুদ্রের ঢেউএ ক্রমাগত ভেসে আসছে, শ্লোগানের তীব্র হুঙ্কার, জনগণের দাবি। তাদের অবরোধ করতে পুলিশ ছুঁড়তে থাকে কাঁদানি গ্যাস। তীরের মতো ছুটছে বন্দুকের গুলী। ক্রমাণ্বয়ে চলছে একের পর এক হৃদ-কাঁপানো বোমা-বারুদের বিস্ফোরণ। মুহূর্তে পরিণত হয়, এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত রণক্ষেত্র। রক্তে ভাসছে গোটা শহর, শহরের রাজপথ। চারিদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। আকাশে বাতাসে ভাসছে বারুদের উগ্র গন্ধ। চোখে পথ দেখা যাচ্ছে না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, চিরশায়িত সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ভাইএর মতো অগণিত বাংলা মায়ের বীর সন্তান, বীর যোদ্ধা। এমতবস্থায় ছাত্ররা দলভঙ্গ হয়ে নিজের আত্ম রক্ষার্থে অন্ধের মতো  দ্বিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করে।  

এমনতেই আজ সকাল থেকে মন-মেজাজ ভালো ছিলনা মমতার। তন্মধ্যে চতুর্দিক থেকে বজ্রপাতের মতো বোমা বাজীর আওয়াজ কানে এসে লাগছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি গায়ের উপর এসে পড়লো। তন্মধ্যে মরার কাঁক একটা জানালার ধারে বসে তীব্র স্বরে কাঁ কাঁ করে ডাকছে। যেন কিছু বলতে চাইছে, কোনো সংবাদ বয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু মায়ের মন, কু-ই গায়। স্বাভাবিক কারণে মনের মধ্যে উদয় হয়, সত্যিই কোনো দুঃসংবাদ বয়ে আনেনি তো! হে ভগবান! ওরে রক্ষা করো। এমন বিপর্যয়ের মুখে খোকা কোথায় আছে, কি অবস্থায় আছে, ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে মমতা। একদন্ডও স্বস্তি পায়না। দ্রæত কিচেনরুম থেকে বেরিয়ে আসে বারান্দায়। বেরিয়ে বারান্দার এমাথা ওমাথা খাঁচার পাখীর মতো অনবরত পায়চারি করতে থাকে। 

একসময় থেমে যায় বোমা বারুদের বিস্ফোরণ। দাঙ্গা, হাঙ্গামা। কিন্তু রয়ে যায় তার রেশ। পশ্চিম প্রান্তে ক্লান্ত সূর্য্য অস্তাচলে ঢলে পড়তেই গোটা পৃথিবীটা যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। গুমোট মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। চারদিক নীরব, নিস্তব্ধ। রক্তে ভাসছে শহরের রাজপথ। অন্যদিকে পুত্র বিয়োগের শোকে, দুঃখে কাতর কত অভাগিনী মায়ের শূন্য বুক অশ্রæবন্যায় ভেসে যাচ্ছে। কিংবা স্বামী হারানোর শোকে বিহŸলে মুহ্যমান হয়ে পড়ছে কত নব পরিণীতা গৃহবধূ।

হঠাৎ মনের অজান্তে বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে মমতার। হৃদস্পন্দন দ্রæত গতীতে চলতে শুরু করে। সবুর সয়না। নেমে আসে আঙ্গিনায়। তাকায় রাস্তার দিকে। চোখ পাকিয়ে দ্যাখে, বিশাল জনসমুদ্রের ঢেউ ওর বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। একদল তরুণ যুবক সাদা কাপড়ে ঢেকে কাকে যেন কাঁধে চেপে নিয়ে আসে। তাদের পিছন পিছন উপছে পড়ছে অগণিত মানুষের ভীঁড়, ঠেলাঠেলি। 

ইতিপূর্বে ছুটে আসে অলকা। ছুটে আসে পাড়া-প্রতিবেশী, বাচ্চা-বুড়ো-জোয়ান প্রতিটি মানুষ। মুহূর্তে বাড়ির চারিধারে ভীঁড় জমে ওঠে। যা ক্ষণপূর্বেও কল্পনা করেনি মমতা। কিন্তু আপনগর্ভে লালিত সন্তান আর মায়ের নারীর চিরন্তন বন্ধন, সে এক অদৃশ্য শক্তি, এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, নারীর টান। তাকে অবরোধ করে সাধ্য কার। আর সেই অদৃশ্য বন্ধন শক্তির প্রভাবে জনমধাত্রী মাতারানি মমতাকে বারান্দা থেকে টেনে নিয়ে আসে প্রশ্বস্ত আঙ্গিনায় মাঝে। 
ততক্ষণে বুঝতে কিছু আর অবশিষ্ঠ থাকে না মমতার। বিদ্যুতের শখের মতো হৃদয়পটভূমিতে জোরে একটা ধাক্কা লাগে। র্থ র্থ করে সারাশরীর কেঁপে ওঠে। ভেঙ্গে পড়ে বোবা কাঁন্নায়। অনুভব করে, পায়ের তলার মাটি যেন সড়ে যাচ্ছে। জমে হীম হয়ে যাচ্ছে সারাশরীর। স্থীর হয়ে আসছে চোখের দৃষ্টি। একসময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভাবসাম্যহীন হয়ে পড়ে। মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই জড়িয়ে ধরে অলকা।  

ততক্ষণে সাদা চাদরে ঢাকা খোকনের রক্তাক্ত মৃতদেহটাকে শোয়ায়ে রাখা হয় বারান্দায়। যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে উজ্জ্বল। জীবনের সব হিসেব নিকেষ চুকিয়ে এসেছে। কত নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোচ্ছে। কোনো চাহিদা আর নেই ওর জীবনে। কারো প্রতিই কোনো আক্ষেপ নেই, অভিমান নেই, অভিযোগ নেই। কিন্তু ওর গর্ভধারিনী মা, মাকে কি জবাব দেবে খোকন? শেষ দেখাও যে দিয়ে গেল না! কেন মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে এভাবে চলে গেল খোকন? এর জবাব মমতা কি পাবে কোনদিন?  

কারো মুখে কথা নেই। সবাই বাক্যাহত, বেদনাহত, মর্মাহত। বিমূঢ়-ম্লান মুখে সবাই দাঁড়িয়ে। সবার চোখে জল। ভীঁড়ের মধ্য থেকে একটি যুবক ছেলে এগিয়ে এসে বলে,-‘কই, উজ্জ্বলের মা কোথায়? ওনাকে ডাকুন!’

কিন্তু কোথায় উজ্জ্বলের মা? তখন ও’ আর ওর মধ্যে নেই। সম্পূর্ণ উদ্মাদ। সমানে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করছে। কখনো আপনমনে বিরবির করছে। কখনো চোখমুখের বিচিত্র অবয়বে নিজের সাথে সমঝোতা করছে। বহু চেষ্টা করেও মমতাকে ঘরের ভিতরে নেওয়া গেলনা। খোকনের মুতদেহের পাশে বসে বার বার শুধু বলছে,-‘আমার খোকাকে তোমরা কেউ দেখেছ? কোথায় গেছে তোমরা জানো? আমার খোকা এখনো বাড়ি ফিরে আসেনি। ওর খাবারগুলি ঢেকে রেখেছি। তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও, চলে যাও। আমি তো আছি। আমার খোকা ফিরে না আসা পর্যন্ত সিঁড়িতেই বসে থাকবো আমি!’ 

হঠাৎ মমতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে অলকা। কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে বলে,-‘আপনার খোকা আর ফিরে আসবে না মাসিমা। উজ্জ্বল আর ফিরে আসবে না। আমাদের মাঝে কোনদিন আর ফিরে আসবে না। ভাষা আন্দোলনে জীবন বলিদান করে গেছে উজ্জ্বল। রাতের অন্ধকার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আমাদের সবার অন্তরে উজ্জ্বল চিরদিন অমর হয়ে থাকবে। ওকে আমরা কোনদিন ভুলবো না।’

যুথিকা বড়ুয়া । টরন্টো, কানাডা

Share:

আরও পড়তে পারেন

Comments

John Doe: Great article!

Jane Smith: Loved this story.