অটোয়া, বুধবার ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

ভিন্ন জীবন (পর্ব-আট)- সুফিয়া ফারজানা

By Ashram | প্রকাশের তারিখ November 14, 2023 | দেখা হয়েছে : 651
ভিন্ন জীবন (পর্ব-আট)- সুফিয়া ফারজানা

ভিন্ন জীবন  (পর্ব-সাত) পড়তে ক্লিক করুন
 পর্ব-আট:    লিলিকে পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে কারখানার সুপারভাইজার মতিন। লিলির মত সুস্বাস্থ্যবতী, কর্মঠ, স্বাবলম্বী একটি মেয়েকে নিজের করে পাওয়া তার এই মুহূর্তে একান্ত দরকার। মেস ছেড়ে দিয়ে একটি বাসা ভাড়া করে মতিন। লিলিকে নিয়ে এই শহরে নতুন করে সংসার পাতার স্বপ্ন দেখে সে। লিলিকে সত্যিই মনে ধরেছে তার। আজকাল ভুলেও গ্রামে ফেলে আসা বউ সালমার কথা মনে পরে না মতিনের। গ্রামে যাওয়াই সে ছেড়ে দিয়েছে ইদানীং। তার স্বপ্নে, জাগরণে এখন লিলি, শুধুই লিলি।।

লিলির মা রাজি হয়ে যান সহজেই। লম্বা চওড়া দেখতে, সুন্দর ব্যবহার, শিক্ষিত ছেলে মতিন। ভালো চাকরিও করে। লিলির বাকী জীবন কিভাবে কাটবে, এই চিন্তায় ঘুম আসে না তার মায়ের। মতিনের মত দায়িত্ববান ছেলের হাতে লিলিকে তুলে দিতে পারলে নিশ্চিন্তে মরতে পারবেন তিনি।

গার্মেন্টস থেকে ফিরে লিলি দেখে, মতিন তার মায়ের সাথে বসে গল্প করছে। লিলিকে দেখেই সে উঠে দাঁড়ায়, "লিলি, আসো, আসো। খালাম্মা মত দিছে, লিলি। সামনের শুক্রবার বিয়া। বিয়ার শাড়ি, গহনা সব আমি নিয়া আসবো। কাজীও নিয়া আসবো আমি। তুমি রাজি তো, লিলি??"

"কি কন এগুলা? কার বিয়া??"

"তোমার আর আমার? আমি তো বলছি তোমারে, আমি তোমারে চাই, বিবাহ করতে চাই।"

"আমি যে এই জীবনে আর বিয়াশাদী করবো না, এইটাও তো কইছি আপনারে। কই নাই?? নাকি ভুইলা গেছেন?"

"আরে, ওইটা তোমার মুখের কথা। মাইয়া মানুষের মুখে এক, মনে আরেক। সেইটা কি আর বুঝি না??"

"না, স্যার। আপনি বুঝতে ভুল করছেন। আমার মুখে যা, মনেও তাই। বিয়া আমি করবো না। এই জীবনে আর না। বিয়া তো আমার হইছে একবার। মাইয়া মানুষের বিয়া একবারই হয়, বার বার না। আপনি চইলা যান দয়া কইরা।"

"তুমি আরেকটু ভাইবা দেখো, লিলি। আরও সাত দিন সময় নাও, ভাবো। যুবতী মাইয়া তুমি, কেমনে একা থাকবা এই শহরে? সারা জীবন একা থাকা কি এতই সোজা? তোমার বয়স কম, তাই বুঝতাছো না।"

"আমি বুঝতে চাইও না। আপনে যান।"

"আচ্ছা, আইজ আসি। তবে আমি আবার আসবো। তোমারে আমার পাইতেই হইবো, সেইটা যেই ভাবেই হউক।"

ঘরে ঢুকেই মায়ের কোল থেকে আলিফকে কেড়ে নেয় লিলি। রাগতঃ স্বরে বলে, "স্যারের লগে সব আলাপ সাইরা ফালাইছো। আমার বিয়া ঠিক, আর আমি কিছু ই জানলাম না? আমার লগে কথা না বইলা কেমনে মত দিলা তুমি?"

"মা রে, জীবনটা নষ্ট করিস না। আমারে ভুল বুঝিস না। আমি তোর মা। তোর কষ্ট সহ্য করতে না পাইরা তোর বাপেও চইলা গেল। অহন আমিও না থাকলে কি করবি তুই? কার কাছে থাকবি সারা জীবন?"

"আমার পোলা আছে না? আমার আলিফ? আমার লাইগ্যা ভাইবো না। বিয়া আমি আর করতে পারমু না, মা। আলিফের বাপের জায়গায় অন্য কাউরে আমি ভাবতে পারি না, ভাবতে চাইও না কোনদিন।"

হঠাৎ আলিফকে বুকে চেপে হু হু করে কেঁদে উঠে লিলি। সে বুঝতে পারে না, সেলিমের মৃত্যুর এত বছর পরেও কেন সে একটি দিনের জন্যও ভুলতে পারে না তাকে? কেন সময়ে অসময়ে, যখন তখন মনে পরে সেই হারিয়ে যাওয়া একান্ত আপন মানুষটাকে? মাত্র ছয় মাসের সংসারে গরিবের মেয়েটিকে বুক উজাড় করা ভালবাসা দিয়েছিল সেই মানুষটা, যা জীবনে কখনও কারও কাছে পায়নি লিলি, আর পাবেও না হয়ত, পেতে চায়ও না সে। সেলিমের সন্তান আর সেই ছয় মাসের সুন্দর স্মৃতি বুকে নিয়েই বাকী জীবন কেটে যাবে তার। 

লিলির স্কুলে যাওয়ার পথে দোকানের বিক্রি বন্ধ রেখে সেলিমের সেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা, তারপর বিয়ে, সেলিমের উদার কণ্ঠের হা হা হাসির শব্দ, কত রাত জেগে বলা কত শত না বলা কথা দুজনের, তারপর, তারপর বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বিনা নোটিশে তার চলে যাওয়া চিরতরে, এসব কি আর এই জীবনে ভুলে যাওয়া সম্ভব?? আজ, এত বছর পর কেন এত কথা, এত স্মৃতি একসাথে মনে ভীড় করছে লিলির? কেন আজ এত কান্না আসছে হঠাৎ?? (চলবে)

সুফিয়া ফারজানা
ঢাকা, বাংলাদেশ

Share:

আরও পড়তে পারেন

Comments

John Doe: Great article!

Jane Smith: Loved this story.