রেবেকা অনেকক্ষণ ধরে 'ফুড ক্লাবে; অপেক্ষা করছে। বিকাল পাঁচটা হতে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে চয়নের চলে আসার কথা। এখনো আসেনি।
হয়তো জরুরী কোন কাজে আটকে গেছে। না হয় রাস্তায় জ্যাম আছে। যাই হোক। এখন চয়নের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। চয়নের মোবাইল ফোনে চার্জ থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। এসব ভাবনা অযথাই ভাবছে রেবেকা। কেননা চয়ন এতো ব্যস্ত সময় কাটায় যে, এতো কিছু ঠিক রাখা চয়নের পক্ষে সম্বব হয়না। এরই মধ্যে চয়ন এসে হাজির।
-আমি আন্তরিক ভাবেই দুঃখিত তোমাকে এতোটা সময় অপেক্ষা করানোর জন্যে। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম ছিলো।
-জি, আমি জানি ভাই। হয় ব্যস্ততা আর না হয় রাস্তায় জ্যাম ছিলো বলেই আপনার আসতে দেরি হয়েছে। অযথা আমাকে কেনো, কোন মানুষকেই অপেক্ষা করানোর মতো মানুষ আপনি নন।
-জি, তুমি ঠিক বলেছো। এবার বলো, তুমি কেমন আছো? ডেকেছো কেন?
-আছি! মুটামুটি ভালো আছি। তবে শুভ্র অনেক বেশি এলো-মেলো ভাবে চলছে। কিছু উগ্র ধরনের বন্ধুদের সঙ্গে মিশে। কোন ভাবেই পরিবর্তন হচ্ছেনা। আমি আর পারছিনা। শুধু অদ্বিতের জন্যই সবকিছু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি। নইলে অনেক আগেই শুভ্রর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতাম।
-অদ্বিত কেমন আছে?
-আছে, ভালো আছে। ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তবে পুরোপুরি ভালো কখনোই হবেনা। তবে যেটুকু হচ্ছে তাও অনেক কিছু।
সবাই যদি সচেতন হতো, তাহলে অটিস্টিক শিশুদের জীবন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যেতো। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি হওয়া উচিত। আস্তে আস্তে উন্নতি হবে। সময় লাগবে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে। থামলে চলবে না।
-জি, অবশ্যই। অটিস্টিক শিশুরা আমাদেরই সন্তান। তাদের প্রতি আমাদের অবশ্যই দায়বদ্ধতা আছে। তোমার লেখা-লেখির কি অবস্থা?
-ভালোনা। অদ্বিতকে সময় দিতে হচ্ছে। তাছাড়া শুভ্রর এলো-মেলো জীবন, আমার কাজকে অনেক পিছিয়ে দিচ্ছে। তারপরও চেষ্টা করছি। আপনার খবর কি ভাই ?
-আমার অবস্থা একই। চলছে মন্থর গতিতে। প্রাইভেট জব করে সময় খুব কম পাই। তবুও আমি আন্তরিক ভাবেই চেষ্টা করছি। এই ইন্টারনেটের যুগে ক'জন মানুষ বই পড়ে। কিন্তু মানুষের বোধোদয় বৃদ্ধির জন্য সাহিত্য অনন্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের হাল ছেড়ে দিলে চলবেনা। আমাদের ক্ষমতা যেহেতু খুব কম। তাই কলম দিয়েই আমাদের লড়াই করে যেতে হবে। একটা ভালো বই যে, কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলে শেষ করা যাবেনা। আমি তখন একাদশ শ্রেণির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। কলেজে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করেছি। বিতর্কের বিষয় ছিলো ' খাদ্য নয় সাহিত্য পারে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে'। আমরা পক্ষের বক্তা ছিলাম। কিন্তু ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে সাহিত্য কতখানি ভূমিকা পালন করে সে ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য নিয়ে আমরা নিজেরাই দ্বিধা-দ্বন্দে ছিলাম। তবে রফিক আজাদের একটা কবিতার লাইন সেদিন আমাদের জয় এনে দিয়েছিল। এক থালা খাদ্য একজন মানুষের সরাসরি ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে। কিন্তু একটি সাহিত্য সরাসরি একজন মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করতে না পারলেও পরোক্ষভাবে একটা দেশের তথা একটি জাতির ক্ষুধা নিবারণের উপায় বের করতে পারে বা ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে। যেমন,
"ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো "!
রফিক আজাদের এই লাইনটিই যথেষ্ট। তাই সাহিত্যও সুন্দর দেশ গড়ার জন্যে অনেক অনেক বড়ো কিছু। দেশের অবস্থা বদলে দিতেও সাহিত্যের ভূমিকা বলে শেষ করা যাবে না।
রেবেকা বিমূঢ়ের মতো শুনছিলো চয়নের কথাগুলো। শুভ্রর অতি মাত্রার খামখেয়ালীতে যখন রেবেকা বেঁচে থাকার ও কাজ করার শক্তি হাড়িয়ে ফেলে, তখনই চয়নের সঙ্গে দেখা করে। কথা বলে। পরামর্শ নেয়। আর চয়নের কথা, পরামর্শে ও সুন্দর সুন্দর সাহিত্যের অপার সৌন্দর্যের উপমায় অবগাহন করে রেবেকা ফিরে পায় লড়াই করার নতুন প্রেরণা ও শক্তি। আর তাইতো রেবেকার দুঃখের দিনগুলিতে চয়ন যেনো একটি গভীর আঁধারে অফুরন্ত আলোর দিশারি, পথপ্রদর্শক।
আর কি বলবে রেবেকা ভেবে পাচ্ছিলনা। এখন ভীষণ ভীষণ ভালো লাগছে।
-অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ভাই। আপনি শুধু যে আমার একজন ভাই, তা'না। আপনি আমার আলোর ঝর্ণা ধারা। আপনি ভালো থাকবেন ভাই। অনেক অনেক ভালো। আমার জন্য দোয়া করবেন। অদ্বিতের জন্য দোয়া করবেন। শুভ্রর জন্যেও দোয়া করবেন। ও যেনো ভালো মানুষ, ভালো বাবা আর একজন দায়িত্ব সম্পন্ন স্বামী হতে পারে।
-অবশ্যই। শুভ্রর সঙ্গে আমি একসঙ্গে একই বিদ্যালয়ে লেখা পড়া করেছি। কতো স্মৃতি আছে আমাদের। শুভ্র আমার প্রিয় ও নির্ভরশীল বন্ধু ছিল। এখনো আছে। ও ঠিক হয়ে যাবে। তবে তোমাকে হতাশ হলে চলবেনা।
-না ভাই, আমি হতাশ নই। তবে মাঝে মাঝে হতাশ লাগে।
-সব ঠিক হয়ে যাবে।
-তাই যেনো হয় ভাই।
-অবশ্যই হবে। তুমি কোনো চিন্তা করোনা।
-না ভাই। ঠিক আছে। আমি সেই সুন্দর দিনের জন্যই অপেক্ষা করছি।
-জি, অবশ্যই সুন্দর দিন আসবেই।
-ভাই, আপনার কথা শুনলে মনে হয়, কিসের দুঃখ, কিসের কষ্ট! সব যেনো সুখের সাগরে ভেসে চলে যায়। আপনি আমাদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করবেন।
রেবেকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখলো। অনেক বেজে গেছে। রাত প্রায় আট'টা বেজেছ।
-ভাই, আজকে উঠা দরকার।
-অবশ্যই। তুমি ভালো থেকো।
-জি ভাই। আপনিও ভালো থাকবেন। সালাম ভাই।
-সালাম বোন।
আজকে বাসায় এসে দেখলো, আব্দুর রহিম অন্য দিনের চেয়ে বেশি খুশি। চয়নের খুব ভালো লাগলো।
-কি ব্যাপার চাচা, আজকে আপনাকে এতো খুশি খুশি লাগছে যে?
-জি, আজকে খুব ভালো লাগছে।
-আজকে বিশেষ কিছু হয়েছে?
-জি, আজকে আব্দুল কুদ্দুস এসে ছবিরনকে ওর বাড়িতে নিয়ে গেছে। অনেক দিন পর মেয়েটা স্বামীর বাড়িতে গেলো। আব্দুল কুদ্দুসের নতুন বউ আব্দুল কুদ্দুসকে ছেড়ে চলে গেছে। সে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত। ছবিরন তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। মেয়েটার জীবন থেকে অন্ধকার দূর হয়েছে। এর চেয়ে ভালো কিছু আর সুখের কিছু কি আছে! তাইতো এতো ভালো লাগছে।
চয়নের কাছে ভীষণ ভীষণ ভালো লাগছে। এতো দিন পর যেনো আঁধার দূর হয়ে আলোয় আলোয় আলোকিত হচ্ছে সবকিছু। আজকে নবনিতা দিদিকে খুব মনে পরছে।
চয়ন চোখ বন্ধ করলো। মনে হলো মন্দিরে নবনিতা দিদির পাশে সুপর্ণা আর চয়ন বসে আছে। বাতাসে ধূপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। শুনতে পাচ্ছে নবনিতা দিদির গাওয়া গান।
" তুমি নির্মল করো। মঙ্গল করে। মলিন মর্ম মুছায়ে!" চলবে…
হুমায়ুন কবির
ঢাকা, বাংলাদেশ।
ফেলে আসা দিনগুলি (চৌদ্দ) -হুমায়ুন কবির
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ August 11, 2019 |
দেখা হয়েছে : 1242
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.