অটোয়া, রবিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বৃক্ষ

By Ashram | প্রকাশের তারিখ February 21, 2026 | দেখা হয়েছে : 24
বৃক্ষ

বাপজান অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মেজাজ তার বড়ই কঠিন। একটু কিছুর অভাব হলেই, শালা-সুমুন্দি উচ্চারণ করে গালিগালাজ করে। আট ছেলে তিন মেয়ের বাপজান তিনি। নাম আব্দুল ওহাব মণ্ডল। তাকে এলাকার সবাই ওহাব মণ্ডল অথবা মণ্ডল বলে সম্বোধন করে।
ছোটরা যার যার সম্পর্ক অনুযায়ী, দাদা-চাচা- মামা-খালু বলেও  ডাকে। আট ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বাবুল মণ্ডল বেশ ধৈর্যশীল ব্যক্তি। বাকি সাত ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সালেহা তার বাপজানকে দেখাশুনা করে। মা মহিদা খাতুন তো  আছেই। তবে মহিদা খাতুনও খানিকটা অসুস্থ। কোনো রকমে নিজের কাজগুলো নিজে নিজে করতে পারে।
সেদিন বাপজান মেজো ছেলের কাছে কি যেন চেয়েছিল। সে হুকুমের গুরুত্ব না দিয়ে, অন্য মনস্ক হয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে, না দেখার ভান করে, চলে যায়। একই অবস্থা করে তৃতীয় ছেলেও। মেজো মেয়ে মায়ের গোড়ে চলে। বাপজান কি বললো, সে গুরুত্ব না দিয়ে, মা'র হুকুমটা বেশি পালন করে বা মা'র কাছাকাছি থাকে। মেজো মেয়ের স্বামী বিদেশ থাকে, তাই সে এ বাড়িতেই থাকে। আট ভাই-ভাবী ও একগাদা ছেলে-মেয়ের সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে সে। 
আব্দুল ওহাব মণ্ডল মেয়েটিকে দেখলেই ক্ষেপে যায়। পাশ দিয়ে গেলেই বলে, শালির মেয়ি, মা'র মেয়ি; বাপে ওকে জন্ম দিইনি।
এমন কথা শুনে শুনে সে অভ্যস্ত। তাই মুখটিপে, ঘাড় ছাপড়িয়ে, মুখে আঁচল দিয়ে, হাসতে হাসতে চলে যায়। সকলেই যখন তার কথা অমান্য করে চলে যায়, তখন সে খুব জোরে জোরে ক্ষুধার্ত পঙ্গু বাঘের মত চিৎকার করে, কন্ গেলিরে শালার মাগী? -এত ছেলিমেয়ি জন্ম দিলি কেউ কথা শোনে না.. .। এরপর খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে এবং এ্যাঁ-উঁ শব্দ করতে থাকে।
তখন মহিদা খাতুন খুব ধীরে ধীরে, পা ফেলে, অনেকটা কষ্ট করে, ওহাব মণ্ডলের চোখ এড়িয়ে, বড় ছেলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বড় ছেলে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে, সে তার মাকে বলে, মা তুমি যাও আমি দেখছি।
বাবুল মণ্ডল খুব ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েই বলে, কী হইলু বাপজান, কী হইলু আমাকে বলো?
বলেই বাপের পায়ের কাছে বসে,ডান পা'টা টিপে দেয়।
প্যারালাইজ বাপের ডান পা'তে যন্ত্রণা হয়, সেটা বাবুল মণ্ডল জানে। তখন ওহাব মণ্ডল হাফাতে-হাফাতে বলে, বাপ, বাপরে, তুই ছাড়া আমার দুঃখু, কুনু শালা বোঝে না।
বাবুল মণ্ডল হাসতে হাসতে বলে, বাপজান আমি তো তুমার রক্ত- তুমার ছেলি।
ওহাব মণ্ডল খুব কষ্ট করে, উঠে বসে, তার বড় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই ছোট ছেলে জহির এসে তার বড় ভাইয়ের গা' ঘেষে বসে সরল মনে নীরবে চেয়ে থাকে। ওহাব মণ্ডল অনেকটা শান্ত হয়ে, জহিরকে জিজ্ঞাসা করে, তোর আবার কী হইলু?
বাপজান দু'শ ট্যাকা লাইগতু। বলে অসহায়ের মত বড় ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বাবুল মণ্ডল একটু উচ্চকণ্ঠে ডাকে, মা, ও মা। 
তখন মহিদা খাতুন মাজায় হাত দিয়ে, একটু সামনে ঝুঁকে পড়ে, শুকনো শরীর নিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে এসে বাবুল মণ্ডলের সামনে দাঁড়ায়, বলো বাপ।
বাবুল মণ্ডল তার বাপজানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওহাব মণ্ডল বড় ছেলের ইশারা বুঝতে পেরে বলে, যাও ওই জইরিকে দু'শ ট্যাকা দ্যাও-গা।
মহিদা খাতুন খুব খুশি হয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে টাকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঘরে ওঠে। জহিরও মা'র পিছন পিছন হাঁটে।
এ সংসারে অসুস্থ আব্দুল ওহাব মণ্ডল বিশাল রাজা এবং বড় ছেলে তার গোলাম। বাদ বাকি, চরিত্র অনুযায়ী সৈনিক।
আর রাণী মহিদা খাতুনের বিশ্বস্ত সহচর মেয়ে সালেহা খাতুন। সালেহা খাতুন সব সময় তার বাপজানের খোঁজ রাখে দূর থেকে। সেবাও করে। গোসল বা খাওয়ানো-পরানো সবই মায়ের সাথে থেকেই করে। তবে তার মায়ের সাথে মেয়েকে দেখলেই ওহাব মণ্ডল রেগে যায়। কেন রাগে তা হয়তো মহিদা খাতুনই জানে। যেদিন বৃদ্ধা, একা এসে, স্বামীর কাছে বসে, সেদিন ওহাব মণ্ডলের মন সারাদিন ভালো থাকে। তবে কেন যেন, মহিদা খাতুন একা, এই বয়সী পুরুষটার কাছে আসতে চায় না। সালেহাও হয়তো কিছুটা বোঝে। তবে বাপজান তো? -তার কথা মনে মনেই রাখে, কোনোদিন প্রকাশ করে না। এভাবেই বড় সংসারটি চলতে চলতে একদিন দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, আব্দুল ওহাব মণ্ডল।
সাত গ্রামের মানুষ দল ধরে গোরস্থানে এসে, মাটি দিয়ে চলে যায়।
আত্মীয়-স্বজনে ভরে যায় বিশাল বাড়িটায়। তারপর সন্ধ্যা হতে হতে, সবাই চলে যায় যার যার মত করে।
বাবুল মণ্ডলের কাছে, দুনিয়ার সব কিছু ফাঁকা-ফাঁকা লাগে, সে দেখতে পায় নদীর বটগাছের অসংখ্য ঝুরিগুলো, গাছ থেকে নেমে নেমে মাটিতে এসে, শত শত বিঘা জমি দখল করে, নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে।
আট ভাই ও তিন বোন একসাথে নিজেরা জড়াজড়ি করে, কান্নাকাটি করতে থাকে। সবাইর কাছে মনে হয়, এতদিন তারা বট বৃক্ষের ছায়ায় বসবাস করতো। এখন সেই বৃক্ষটা, কেউ যেন কেটে ফেলেছে। কোথাও কোনো ছায়া নেই, ধু-ধু রৌদ্র।
ফুটবল খেলার মত বড় উঠানে বসে, দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ভাইবোনদের সান্ত্বনা দেয় বাবুল মণ্ডল, দুনিয়ায় আশা আর যাওয়ারে...। 
বলতে বলতেই বৃক্ষ ছায়ায় বেড়ে উঠা গাছগুলো দূরে দূরে সরে যায়, বেড়ে উঠতে চায় নিজ অস্তিত্ব নিয়ে।

চুয়াডাঙ্গা।

Share:

আরও পড়তে পারেন

Comments

John Doe: Great article!

Jane Smith: Loved this story.