অটোয়া, রবিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ফড়িং-ধরা বিকেল (দ্বিতীয় অংশ) – নূরুন্‌ নাহার

By Ashram | প্রকাশের তারিখ August 8, 2017 | দেখা হয়েছে : 3038
ফড়িং-ধরা বিকেল (দ্বিতীয় অংশ) – নূরুন্‌ নাহার

  
ফড়িং-ধরা বিকেল প্রথম অংশ পড়তে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় অংশ 

ফিরে যাই আবার স্মৃতির ভাটায়
[ উৎসর্গঃ দূরদর্শী আরজ আলী মাতুব্বর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও হাসান আজিজুল হক-কে ]

বার ফিরে যাই বেনাপোলের সেই স্মৃতির ভাটায়, রেললাইনের ধারে, পাথরের বুকে।
রেলগাড়ি আসার সময় হলে দল ধরে রেললাইনের ওপরে কান পেতে শুয়ে থাকতাম আমরা। দূর থেকে যখন রেলগাড়ি আসত তখন ঝিক্‌-ঝিক্‌ শব্দ হতো। সেই শব্দ ছিল তাল-লয় আর ছন্দে গাঁথা। সেই শব্দ শোনার কত যে অপেক্ষা ছিল আমাদের, তা বুঝি আজ দূর-দেশের স্মৃতির রূপকথা।
রেলগাড়ির সেই তাল-লয় আর ছন্দে গাঁথা শব্দগুলো যেন কানের ভেতর দিয়ে একেবারে বুকের ভেতর ঢুকে যেতো। বুকটা তখন আনন্দে ভ্রে উঠতো। সেই আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠতাম আমরা। আজও চোখ বন্ধ করলেই কাছে টানে সেই রেলগাড়ির ঝিক্‌-ঝিক্‌ শব্দ আর দূর-দেশের সেই স্মৃতির রূপকথারা।
চোখ খুললেই দেখি সবকিছুরই আজ তাল কেটে গেছে। আনন্দ গেছে পালিয়ে। শব্দগুলোও কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে গেছে। এই তাল-কাটা খাপছাড়া শব্দ শোনার অপেক্ষায় কি সেদিন ছিলাম? ভাবলেই মনটা আবার ভিজে যায়। আবারও প্রশ্নেরা এসে ভিড় করে মনের ভেতর।
কোথায় পাবো এর মন-ছোঁয়া উত্তর? না-পাওয়া উত্তরের শূন্যতায় চোখ দু’টো জল-ছলছল করে ওঠে। হাতের পিঠ দিয়ে চোখ দু’টো মুছি—
আর স্মৃতির ভাটায় ঘুরে ঘুরে সুখ-ভরা দিনগুলি খুঁজি।

আবিষ্কারের খেলা
[ উৎসর্গঃ জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও ফজলুর রহমান খান— যাঁদের সৃজনশীলতায় পৃথিবী আলোকিত ]

রেললাইনের ধারে বসে পাথর কুড়িয়ে পাঁচ-গুটি খেলতাম আমরা। খেলা শেষে পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতাম। পাথরে পাথর ঘষলে যে আগুনের মতো ঝলক দেখা যায়, তা ছিল আমাদের আদিম ক্ষুদে বিজ্ঞানীর মতো একরকম আবিষ্কারের খেলা। এটা ছিল আমাদের শৈশব-জীবনের বিশাল আবিষ্কার।
এ খেলাতে ছিল আবিষ্কারের মত আনন্দ। আমরা তখন পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতাম। আর আজ জীবনে জীবন ঘষে আগুন জ্বালাতে হচ্ছে। এ যেন এক বাধ্যগত আগুনের খেলা। এ খেলাতে আছে শুধু অনাগত নিরানন্দ। এই নিরানন্দ জীবনের টুঁটি ছিঁড়ে আবারও ফিরে যেতে ইচ্ছে করে শুধুই শীতল আনন্দে।
জীবন-ঘষা আগুনের জ্বলন্ত উত্তাপের জ্বালাপোড়া থেকে নিষ্কৃতি নিয়ে টুপ করে ডুব দিতে ইচ্ছে করে বর্ষায় ডোবা টলটলে দিঘি-ভরা-জলে। এক নিমিষে মনের যত আগুন নিভিয়ে নিখাদ আনন্দে লোটপুটি খেতে ইচ্ছে করে—
আর আবারও ক্ষুদে-বিজ্ঞানীর মতো সেই আনন্দ-ঘেরা আবিষ্কারের খেলায় মেতে উঠতে ইচ্ছে করে।

পাল্টে যাওয়ার খেলা
[ উৎসর্গঃ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এস.এম. সুলতান, মোস্তফা আজিজ ও মোস্তফা মনোয়ার-কে ]

র একটা খেলা খেলতাম আমরা। রেলগাড়ি আসার সময় হলে তাক করে থাকতাম। তারপর রেললাইনের ওপরে এক পয়সা, দু’পয়সা আর শিশা দিয়ে রাখতাম। রেলগাড়ি যখন ওসবের ওপর দিয়ে যেতো, তখন রেলগাড়ির চাপে ওগুলোর চেহারা যেতো পাল্টে। ওগুলো সব চ্যাপ্টা হয়ে লম্বা হয়ে যেতো। তখন ওগুলো আমরা হাতে তুলে নিয়ে মন ভরে দেখতাম আর ভাবতাম কীভাবে একটা জিনিসের চাপে আর একটা জিনিসের আসল-রূপ যায় পাল্টে। এটাও যেন ছিল আমাদের সেই অবুঝ-বেলার পাল্টে যাওয়ার খেলা, রূপান্তরের খেলা। এ খেলাতেও ছিল যেন আবিষ্কারের মতো মধুর গন্ধ, ছন্দ, আনন্দ। সবকিছুতেই ছিল যেন তালের মতো সুর।
আজও আমরা পাল্টে যাওয়ার খেলাই খেলছি। জীবনের চাপে কালে-কালে পাল্টে যাচ্ছে জীবনের রূপ। কিন্তু এ পাল্টে যাওয়ার রূপে নেই কোনো আনন্দ, নেই কোনো সুখ। আছে শুধু মন-পোড়ানো ধূপ। এই মন-পোড়ানো ধূপের গন্ধ সরিয়ে সেই মধুর মতো গন্ধে, ছন্দে, আনন্দে মন মেতে উঠতে চায়। বার বার মন ফিরে যায় সেই পাল্টে যাওয়ার খেলায়, রূপান্তরের খেলায়।

রেলের গার্ড সাহেবকে সালাম
[ উৎসর্গঃ স্বপ্ন-সঞ্চারী ওমর আলী, এম.এ. গফুর ও অধ্যাপক খলিলুর রহমান-কে ]

মাদের বাসার সামনে দিয়েই যেত রেলগাড়ি ওপার-বাংলা ভারতে। আমাদের খুব কাছে টানতো রেলগাড়ি যাওয়ার সেই সময়টা। সকাল, দুপুর, বিকেল, যখনই রেলগাড়ি যেত, তখনই আমরা বাসার ঘুরানো বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে রেলের গার্ড সাহেবকে সালাম দিতাম সবাই মিলে, সুর করে। গার্ড সাহেবও তাঁর লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে, দু’পাটি সাদা শাপলার মতো দাঁতের হাসি মিশিয়ে উত্তর দিতেন আমাদের সালামের। আমরা তখন হাসিতে কুটিকুটি হয়ে একজন আর একজনকে জড়িয়ে ধরতাম আনন্দে। সবকিছুতেই কেমন যেন সুর ছিল। কোথায় গেল সেই সুরের মতো বাঁশি, আনন্দের হাসি, তালের মতো সুর। দূর বহুদূর!
তখন জীবন ছিল আনন্দের মেলা আর সুরের খেলা। মনের ভেতর শুধু হাতড়ে বেড়াই কী যেন। বহুদূর ছুটে যেতে ইচ্ছে করে, সেই আকাশ যেখানে মনে হয় মাটি ছুঁয়েছে। আকাশ আর মাটিকে জড়িয়ে ধরে কী যেন বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কিছুই আর বলতে পারিনে। দৃষ্টি আছড়ে পড়ে বহুদূরে। টুপ করে গাল বেয়ে দু’ফোঁটা জল পড়ে। শ্বাস দীর্ঘ হয়। বুকটা হুহু করে ওঠে। মনটা আবার পেছনে ছোটে ... ... .... চলবে

ঢাকা, বাংলাদেশ

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন
ছড়া ও কবিতাঃ বর্ষা যখন – নূরুন্‌ নাহার

Share:

আরও পড়তে পারেন

Comments

John Doe: Great article!

Jane Smith: Loved this story.