পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তার পাশে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তক্তার তৈরি বসার মাচায় একান্ত একলা ভাবে বসে বৈকালিক সময় কাটাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে ফর্সা চেহারা কোঁকড়ানো চুল, সদ্য কাটা হয়েছে এমন এক যুবক এসে মাচার একপাশে এসে বসেছে। একটা রাস্ট কালারের গোল গলার টি সার্ট পরনে। সঙ্গে রয়েছে একটা লাল ছোট ছোট চরকাকাটা বাঁকড়ি গামছা। দুজনেই কিছু সময় মাচার দুই পাশে চুপচাপ বসে থাকার পর যুবক ছেলেটি আমাকে প্রশ্ন করে বসল
"আপনার কোন গুণীন জানা আছে। ঐ যারা তুকতাক, মন্ত্রতন্ত কাটান করে আর কি?"
আমি বললাম তোমার গুণীন দিয়ে কী হবে?
ও বললে,
"আমার সময় ভালো যাচ্ছে না। কোন গুণীন দিয়ে ছাড়াবেড়া করতাম আর কি? এখন আমার চারপাশে শত্রু। - দেখুন আজ চুল কাটিয়েছি। এটাকে চুল কাটা বলে ? সব সেটিং। আমার ওপর সকলেই চক্রান্ত করছে।"
অবশ্য মুখে কিছু না বললেও আমি সদ্য কাটা চুলের দিকে নজর দিয়ে, কোন খারাপ কিছু দেখলাম না। আমি চেনাজানা কোন গুণীন এর কথা মনে মনে ভাবছি। আমার মনে প্রশ্ন জাগল এর আসল সমস্যাটা কী আগে জানতে হবে। বললাম তোমার এখন সমস্যা কি হচ্ছে।
- আমার পিছনে সকলেই লেগে পড়েছে। আমি গ্রামের শান্তশিষ্ট ভালো ছেলে। কারো উপকার ছাড়া অপকার করিনি কোনদিন। কিন্তু আজ আমার পিছনে সকলেই চক্রান্ত করে ফাঁসিয়ে চলেছে। আমি ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। ঐ দশ এগারো বৎসর বয়স থেকে সোনার শিল্পের কাজ শিখে কাজ করে চলেছি। কত লোকের উপকার করেছি। যাদের উপকার করেছি তারাই আমাকে নানা ভাবে বিপদে ফেলেছে। এখানকার মানুষ ভালো নয়।
আমি বললাম কি রকম বিপদ?
- আমার বিরুদ্ধে মেয়েদের গায়ে পড়ে লাগার অপবাদ ছড়িয়ে সকলের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। যে মহিলাকে পিছনে লাগিয়ে দিয়েছে সেই মহিলাই আমাকে তুকতাক করেছে। মহিলা আমাকে কিছু জড়িভুটি খাইয়ে বশীকরণ করেছে। আপনি বলুন এমনি এমনি কিছু হয়।
আমি বললাম বাড়িতে কে কে আছে?
- আমার চারপাশে কেউ নেই! আমি একা।
মা, বাবা নেই?
- আছে। তবে নেই।
আপনার কাছে কোন আশ্রমের খোঁজ আছে। আমি আশ্রমের সাধুদের সেবা করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। সাধুবাবাদের আমার জীবনের কথা বলব, ওরা আমার সমস্ত তুকতাক কাট ছাঁট করে দেবে।
আমি বললাম আশ্রম ভালো না হলে সেখানেও তোমাকে ঠকাবে। রামকৃষ্ণ মিশনের কোন আশ্রমের খোঁজ নিতে পারো। ইত্যবসরে আমি এক পরিচিত ভট্টাচার্য মশায়ের ছেলের নাম্বারে ফোন লাগালে ওপার থেকে সুইচ অফ থাকার কথাই ভেসে এল। তাই যোগাযোগ হল না।
আমি বললাম তুমি কি কাজ করতে?
- আমি দশ বৎসর বয়স থেকে সোনার শিল্পের কাজ শিখেছি। দিল্লিতে থাকতাম। ওখানেও পরিচিত সকলে পিছনে লাগার জন্যই দিল্লি ছেড়ে এসেছি।
আমি বললাম যখন ভালো কাজ জানো তো দিল্লিতে না গিয়ে অপরিচিত কোন বন্ধুদের সঙ্গে চেন্নাই, মাদ্রআজের দিকে চলে গিয়ে কাজ করতে পারতে। বিয়ে করেছো?
- বিয়ে আর ওরা হতে দেবে? দেখি কোন আশ্রমেই চলে যাবো! দিল্লিতে ভালো আশ্রম আছে। মধ্য প্রদেশে একটা আশ্রম দেখে ছিলাম। কোন সাধুর সেবা করেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব।
তোমার রোজগারের কিছু টাকা পয়সা আছে?
- হ্যাঁ, প্রায় আট লাক টাকা আছে। ওতেই ভালো ভাবে চলে যাবে।
তুমি তো যখন কাজ শিখেছো। কাজেই মন বসাও। অচেনা শহরে নুতন পরিবেশে চলে গেলেই আর কোন ঝামেলা হবে না।
- সেই ল্যাং টা বয়স থেকে অর্থাৎ ছেলেবেলার থেকে কাজ করছি আর কাজযোগে মন নেই।
আমার প্রাথমিক পরিচয় জানতে পেরে বলে বসল,
- আপনি একজন শিক্ষক, আপনার কাছে আমি কী মিথ্যে কথা বলব। তাছাড়া দেখলেন তো টিকটিকি টিকটিকি করলে যে। আমার খুব বিপদ। ঐ যে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গেল। ওকে আমি টাকা ধার দিয়ে ছিলাম। এক সপ্তাহ পরে ঘরে এসে ঝগড়া করে গেল। আমি যাদের উপকার করেছি তারাই এখন আমার শত্রু। আমাদের গ্রামের একটা ছেলে আমার সঙ্গে কাজ শিখতে দিল্লিতে গিয়ে ছিল ছিল। সে গোপনে বিড়ি খেত। আমি ওকে জোড় হাত করে বললাম - - " বিড়ি খাসনা। কোন নেশা করিস না। " আমার কথা না শুনে পোড়া বিড়ি গুড়িয়ে গুড়িয়ে লুকিয়ে খেত। আমার খারাপ লাগতো। ওকে তাই প্রত্যেক দিন দশ টাকা করে হাত খরচা দিতাম। যদিবা বিড়ি খাস দু একটা কিনেই খাবি ? আমি কি ওর খারাপ করেছি। ওরাই এখন আমার ফোন নিয়ে প্যাটার্ন লক্ করে দিয়েছে। আমাকে নেশা করতে শিখয়ে খারাপ পথে চালিত করেছে। মেয়ে ঘটিত খবর করেছে। আমার জীবনটাকে শেষ করে দিল। জানেন আমি প্রতিদিন একটা করে ঘুমের ট্যাবলেট না খেলে ঘুমাতেই পারি না।
না আসছি। ভালো থাকুন আপনি? আবার কেউ দেখে ফেলবে। সব জায়গায় চর লাগিয়ে রেখেছে ওরা।
আমি বললাম তুমিও ভালো থেকো। ও মাচা থেকে নেমে আসতে আসতে গ্রামের বাঁশ বনের সিউড়ি রাস্তা ধরে চলতে শুরু করল।
আমার মনে একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেল?
পুরুলিয়া।
অবসাদ - বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ June 25, 2024 |
দেখা হয়েছে : 874
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.