নীলাদ্রিকে চিনতো অনুমা ছোটকার বন্ধু হিসাবে অনেক দিন ধরেই, বলতে গেলে ছোটকার অভিন্ন বন্ধু হিসাবে বাড়ির কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর ছিল অবারিত দ্বার। অনুমার আজকের এই তেইশ বছরের জীবনেও সে কখনও ভাবতে পারেনি অতীতের পনেরো ষোলো বছর বয়সী অনুমার টানেই সে আসতো তাদের এই অতি সাধারণ পরিবারে বুঝলো আজ চিঠিগুলো পড়ে!
অনুমার ছোটকা তার থেকে মাত্র পাঁচ বছরের বড়। সে যাই হোক, কাকা কাকাই হয়, তাঁর বন্ধুরাও সে রকম কাকা এই শিক্ষাতেই ছোটো বেলা থেকে বড়ো হয়েছে তাদের এই সাধারণ শিক্ষিত যৌথ পরিবারে। শিক্ষিত সুদর্শন ধনী পরিবারের একমাত্র ছেলে নীলাদ্রি মারা গেছে আজ কয়েকটা বছর হয়ে গেছে। এতদিন বাদে অনুমা জানলো সে আসতো তার ঝর্ণার মতো হাসি শুনতে তার একঢাল কালো চুলের ঘ্রাণ নিতে কিংবা এক ঝলক তাকে দেখতে।
মনে আছে অনুমার, প্রায় নিয়মিত এ বাড়িতে আসতো নীলাদ্রী। একদিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল আসা। অনুমার মা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ছোটকাকে প্রশ্ন করেছে- নীলাদ্রির খবর কীরে? অনেক দিন ও এ বাড়িতে আসছে না।
ছোটকা একটু ইতস্তত করে জানালো তোমাকে বলা হয় নি বৌদি - নীলাদ্রি কিছু দিন হলো বাইক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে। মা অবাক হয়ে বলেছিল এটা ভুলে যাবার কথা। অনুমা ও অবাক হয়ে বলে- ভুলে গেলে কী করে ছোটকা। তবে সেটা অন্য কোনো কিছুই ছিল না। সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী এরপর যে সব কথাবার্তা হওয়া উচিত তাই হয়েছিল। আজ অনুমার মনে হচ্ছে ছোটকা কিছু জানতো তা না হলে এমন বন্ধুর মৃত্যুর খবর চেপে গিয়েছিল!
যাইহোক এরপর আর নীলাদ্রির কথা এই বাড়িতে খুব একটা হতো না। কালের নিয়মে সবাই কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়। দেখতে দেখতে কেটে যায় পাঁচটা বছর। ছোটকার কাজে উন্নতি হয়, একটা মিষ্টি ছোটোকাকী ঘরে আসে। ষোল বছরের অনুমা এম এ পাশ করা তেইশ বছরের যুবতী। অনুমা চেষ্টা করছে একটা ভালো কাজের আর বাড়ি ব্যস্ত ওকে অন্য ঘরে পাঠানো নিয়ে। এই রকম এক সময়ে ছোটকা তখন ছোটো কাকী সহ বাইরে হঠাৎ এক ফোন এলো বাড়ির ল্যান্ড লাইনে, অনুমার বাবা ফোনটা অনুমাকে দিয়ে বললেন -- তোর ফোন, একজন মহিলা তোকে চাইছে। অনুমা ফোনে 'হ্যালো ' বলতেই ওপার থেকে একজন মহিলা বলে উঠলেন- ভালো আছো তো অনুমা, তুমি আমাকে চিনবে না, আমি নীলাদ্রির মা কথা বলছি। বিষ্ময় কাটিয়ে অনুমা বলে উঠলো মানে! তার কথা শেষ হবার আগেই তিনি আবার বলে উঠলেন তোমার কাকার বন্ধু নীলাদ্রির মা, আমার তোমাকে খুব দরকার, উনি অনুমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঠিকানা বলে দিলেন আর অনুমা ও সম্মোহনের মতো খাতায় লিখে নিয়ে বাবা ও মা কে জানিয়ে সাথে একরাশ চিন্তা মাথায় নিয়ে নীলাদ্রিদের বাড়ির পথে পা বাড়ালো।
পথে যেতে যেতে ভাবলো ছোটকা থাকলে ভালো হতো, উনি হয়তো ছোটকা কে-ই কিছু বলতে চান বা দরকার এসব ভাবতে ভাবতেই পৌঁছে গেল নির্দিষ্ট ঠিকানায়। কলিংবেল বাজাতেই কাজের লোক এসে দরজা খুলে বলল মা দোতলায় আছে আপনি এই সিঁড়ি দিয়ে চলে যান। অনুমা ভাবতে পারছে না সে ঠিক কাজ করছে কি-না। এক সময় ছোটকার কাছে শুনেছিলো এক ছোট্ট রাজ প্রাসাদের রাজপুত্র নীলাদ্রি কিন্তু এতো এক মৃত্যু পুরী মনে হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে থমকে গেল দেওয়ালে টাঙানো নীলাদ্রির বাইকে বসা বিশাল ছবির দিকে তাকিয়ে। এ সময় একজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এসে বললেন আমি নীলাদ্রির বাবা, তুমি ওই ঘরে যাও নীলাদ্রির মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, এই বলে তিনি দেখিয়ে দিলেন ঘর। নীলাদ্রির মা কিছুক্ষণ অনুমার দিকে তাকিয়ে কোনো গৌরচন্দ্রিকা না করেই বললেন আমরা এই বাড়ি বিক্রি করে বেনারসে গুরুদেবের আশ্রমে চলে যাচ্ছি। নীলাদ্রি আমার একমাত্র পুত্র ছিল, তার এই অসময়ে চলে যাওয়া আর মেনে নিতে পারছি না তাই যাক সে কথা...।
তাকে কেন ডেকে আনা হলো অনুমা বুঝে উঠতে পারছে না। নীলাদ্রির মা অনুমাকে বললেন তোমাকে বেশীক্ষণ আটকাবো না, কিছু জিনিস দেবার ছিল সেটা দেবার জন্যই ফোন করে ডেকে আনলাম এই বলে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন অনুমার হাতে। হতবিহ্বল অনুমা বললো এটা কী ছোটকাকে দিতে হবে? তিনি অপার চোখে অনুমাকে ক্ষানিক দেখে দৃঢ় গলায় বললেন -এগুলো তোমার সম্পত্তি যা আমার পুত্র তোমার জন্য রেখে গিয়েছে, আজ পাঁচ বছর ধরে যা আমি আগলে রেখেছি। এখানকার সব কিছু বিক্রি করে দিলাম কিন্তু আমার মনে হলো এগুলোর মালিক তুমি তাই যাবার আগে তোমাকে দিয়ে গেলাম। অনুমা এতখানি বিহ্বল কোনো কথা বলে উঠতে পারলো না। সে যে এদের ভালো করে জানে না, চেনেও না কী উত্তর দেবে। বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের দরজায় খিল আটকে অনুমা প্যাকেটের মুখ খুলতেই ইতস্তত ছড়িয়ে গেল কয়েকটা খাম বন্ধ চিঠি যার উপরে অনুমার নাম লেখা, কিছু ফটো, একটি সোনার চেন ও একজোড়া কানের দুল, তখনো অনুমা ভাবতে পারে নি কত বিষ্ময় অপেক্ষা করছে তার জন্য পাঁচটা বছর ধরে। কাঁপা হাতে ফটোগুলো তুলে ধরলো চোখের সামনে - সমস্ত ফটোগুলো শুধু তারই কিশোরী বেলার মুখ, কোনোটাতে শুধুই হাসি মুখ আবার কোথাও শুধুই তার একঢাল চুল। বাড়ির সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে ক্যামেরা হাতে ফটো তুলতে তুলতে কখন এই গুলো তুলেছে জানতে ও পারেনি অনুমা। তাকে লেখা এতো চিঠি কোনোদিন আসে নি তার হাতে। দুই একটা চিঠি পড়তে পড়তে এক একটা জায়গায় থমকে যায় অনুমা! নীলাদ্রি তার মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে তাকেই দায়ী করে গেছে- এই তো স্পষ্ট লেখা একটা লাইন -' আমি একদিন বাইক দুর্ঘটনায় মারা যাবো অনুমা, কারন চোখের সামনে যদি সব সময় তোমাকে দেখি গাড়ি চালাবো কী করে? দূর থেকে বাস আসছে আর আমি দেখি তুমি একঢাল কালো চুল নিয়ে হাসতে হাসতে ছুটতে ছুটতে আসছো সম্বিত ফিরে পাই লোকজনের চিৎকারে এরকম হলে আর ক' দিন বাঁচবো বলো তো''? একটা চিঠিতে লেখা তোমার জন্মদিনের জন্য একটা হার ওদুল কিনেছিলাম কিন্তু দিতে সাহস হলো না কারন আমি শুধুমাত্র তোমার টানেই ও বাড়িতে যাই। এরকম ভাবে চিঠি ঘাটতে ঘাটতে এক জায়গায় রক্ত হিম হয়ে গেল অনুমার, সেখানে লেখা -' আমি চলে গেলে তুমি দায়ী কারন তুমি আমাকে বোঝার চেষ্টা করো না'। কিছুতেই আর পড়তে পারলো না অনুমা। সব চিঠি পত্র আবার প্যাকেটে রেখে বন্ধ ঘরে বসে ভাবতে থাকে সত্যি কী একটা মৃত্যুর জন্য সে দায়ী! কেন সে পাঁচবছর ধরে জড়িয়ে রইলো একটা মৃত্যুর নেপথ্যের নায়িকা হয়ে। পিছনে ফেলে আসা কয়েকটি বছর আগে তার কিশোরী মনে যখন ভালোবাসা দানা বাঁধে নি তখন এক যুবকের মৃত্যুর জন্য কেন সে দোষী হবে ভেবে পায় না অনুমা। আজ তা হৃদয় ভারাক্রান্ত এই অপরাধ না করে ও এক অজানা অপরাধের অপরাধী হয়ে কাটাতে হবে তাকে তার বাকি জীবন। এই রহস্য কোনোদিন ও কেউ জানতে পারবে না, নতুন করে হবে না কোনো পুলিশী আক্রমণ বা আইন আদালত অথচ তার এই দীর্ঘ জীবনে এই অজানা অপরাধের বিচার পাবে কীভাবে তাও অজানা অনুমার।
জয়তী চক্রবর্তী। পশ্চিম বর্ধমান
অজানা অপরাধ - জয়তী চক্রবর্তী
By Ashram |
প্রকাশের তারিখ July 22, 2020 |
দেখা হয়েছে : 1237
আরও পড়তে পারেন
Comments
John Doe: Great article!
Jane Smith: Loved this story.