“মহীনের ঘোড়াগুলি” শব্দদুটি শুনলে জীবনানন্দ দাশের কথা মনে আসে। মহীনের ঘোড়াগুলি জীবনানন্দের পরাবাস্তববাদী “ঘোড়া” কবিতার প্রস্তর যুগের অলৌকিক ঘোড়া। এই কবিতার বিখ্যাত পঙক্তিটি জীবনানন্দের সব পাঠকের জানাঃ ‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্ত্তিকের জ্যোত্স্নার প্রান্তরে।’ কিন্তু শুনতে বেমানান হলেও মহীনের ঘোড়াগুলি (সামান্য ভিন্ন বানান) সত্তুর দশকের কলকাতার প্রথম রক ব্যান্ড। তার অপ্রচলিত নামের মতই ব্যান্ডটির সংগীত আয়োজনও ছিল প্রচলিত ধারা থেকে ভিন্ন – না ‘আধুনিক’ না অনাধুনকি। ব্যান্ডটির সংগঠকরা বাঙলা লোকসঙ্গীত ও পশ্চিমা রক-পপের মিশ্রণে তৈরি এই নতুন ধারার নাম দিয়েছিলেন বাউল-জাজ। কিন্তু এই নতুন ধারা কলকাতার সঙ্গীতানুরাগীদের আকৃষ্ট করতে পারে নি। বাঙালির কাছে তখন গান মানেই তথাকথিত ‘আধুনিক’ ও ছায়াছবির প্রেমের গান। মহীনের ঘোড়াগুলির প্রেমহীন গান রোমান্টিকতার ঘোরে আচ্ছন্ন বাঙালির রুচি পাল্টাতে সক্ষম হয়নি – অন্তত সত্তুর দশকে। ফলে, ১৯৭৫ সালে শুরু করে ছয় বছরের মাথায়, ১৯৮১ সালে, ব্যান্ডটি বন্ধ করে দিতে হয়।
সম্ভবত নতুনত্বের কারণে এই ব্যান্ড কলকাতার সঙ্গীত সমালোচকদের মোটেও সন্তুষ্টু করতে পারেনি। এই ব্যান্ডের গানে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র (গিটার, ড্রাম, স্যাক্সোফোন) ব্যবহার করা হয়ে বলে সাংবাদিকরা তাদেরকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, এরা সব ইংরেজি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে। অথচ বাঙলা গানে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রের এবং এমনকি পশ্চিমা সঙ্গীতের ব্যবহার নতুন ছিল না। অনেকে এই ব্যান্ডের সঙ্গীত আয়োজন প্রত্যাখান করে বলে, এদের তো গলাই শোনা যায় না (মানে যেমন শোনা যায় উত্তম-সুচিত্রার ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানে হেমন্ত-সন্ধ্যার গলা)। এক টেলিভিশন সংবাদে এই ব্যান্ডের অনুষ্ঠানকে পেলভিস (এলভিস এর বদলে) প্রিসলির নাচগান বলে ব্যাঙ্গ করা হয়। মোট কথা, কলকাতার সঙ্গীত সমাজ তাদেরকে বাঙলা গানের গতানুগতিক ধারা বদলাতে দিতে মোটেও রাজি ছিল না।
সঙ্গীতের ধারার বিবর্তন নিয়ে রক্ষণশীলতা কোনো নতুন ঘটনা নয়। কখনো কখনো বিজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞরাও উদ্ভাবনীমূলক সঙ্গীত মেনে নিতে পারেনি। বিশ শতকের শুরুতে যখন আমেরিকায় জাজ সঙ্গীতের বিস্তার লাভ করতে শুরু করে, তখন তা আমেরিকার একাধিক স্টেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বলা হয়, জাজ বলশেভিকদের হট্টগোল, আমেরিকার সঙ্গীতের ঐতিহ্য ও নৈতিকতা কলুষিত করতে কালো আমেরিকানদের অপচেষ্টা। দুই-তিন দশকের মধ্যে সেই হট্টগোলই আমেরিকান সঙ্গীতের ঐতিহ্যে পরিণত হয়। প্রায় অনুরূপ সময়ে রবীন্দ্রনাথ বাঙলা গানের কাঠামোতে আমূল পরিবর্ন আনেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে তিনি বাঙলা গানের একটি নতুন কাঠামো তৈরি করেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতবিদ দীলিপ কুমার রায় (১৮৯৭-১৯৮০) এর বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু কালক্রমে রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত সেই কাঠামো বাঙলা ‘আধুনিক’ গানের কাঠামোতে পরিণত হয়। বাঙালি শ্রোতারা এই বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। রবীন্দ্রনাথ যে লোকসঙ্গীত ব্যবহার করে আধুনিক গান তৈরি করেছেন তার জন্যও তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। গগন হরকরার বাউল সুরের গান ‘আমি কোথায় পাব তারে’ রূপান্তর করে তিনি রচনা করেন অমর দেশপ্রেমের গান ‘আমার সোনার বাঙলা’। বাংলাদেশীদের সৌভাগ্য যে সেটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
লোকসঙ্গীতের ঘরানা থেকে চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকে কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনপুষ্ট ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (ইন্ডিয়ান পিপলস্ থিয়েটার এ্যাসোসিয়েশন) গণসঙ্গীত নামে আরেকটি নতুন ধারার সৃষ্টি করে। গণনাট্য সঙ্ঘের সাথে সক্রিয় ছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, এবং এমন কি রবিশঙ্কর এর মত প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। তাঁরা এই নতুন ধারায় গানের কথা ও সুরে এক নতুন শৈলী প্রবর্তন করেন যা প্রতিবাদের ভাষা ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু বামপন্থীদের সমর্থনপুষ্ট গণনাট্যের এই নতুন ধারা চেতনা জাগরণের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হলেও তা সর্বস্তরে জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। কিছু ব্যতিক্রম যে ছিল না যে তা নয়। যেমন, সলিল চৌধুরীর ১৯৪৯ সালে রচিত ‘ও আলোর পথযাত্রী’ এবং এরকম অনেক গণজাগরণের গান বিনোদনের গান হিসেবেও সমাদৃত হয়।
এই গণসঙ্গীত আন্দোলনের সাথে মহীনের ঘোড়াগুলির কোনো প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না। এর নতুন ধারার গানে যার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল তা হল নকশালবাড়ি আন্দোলন (১৯৬৭-১৯৭৫)। সত্তুর দশক ছিল কলকাতার জন্য এক উত্তাল দশক; নকশালবাড়ি আন্দোলন গোটা শহরকে প্রায় অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, বা মহীনের ঘোড়াগুলির ভাষায় কলকাতাকে “থতমত শহরে” পরিণত করেছিল। মহীনের ঘোড়াগুলি যখন শুরু হয় তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের উত্তাপ থেমে গেছে। এই ব্যান্ডের পুরোধা, গৌতম চট্টোপাধ্যায় (১৯৪৯-১৯৯৯), নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রাক্তন কর্মী, কারাবাস ও নির্বাসন শেষে কলকাতায় ফিরে এসে সমমনা আরো ছয়জন তরুণ শিল্পীদের নিয়ে এমন এক নতুন ধারার সঙ্গীত সৃষ্টির উদ্যোগ নেন যা তাঁর বাম ধারার সামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শ সমুন্নত রাখবে। কারো কারো মতে তাঁদের সেই ধারার অনুপ্রেরণার আরেক উৎস ছিল বব ডিলানের গান। কিন্তু সেটা সম্পর্ণ সঠিক নয়, কারণ ব্যান্ডটির আরেক অন্যতম সদস্য তাপস দাসের এক সাক্ষাতকার থেকে জানা যায় যে তাঁরা ছিলেন বিটলস্ এর ভক্ত। অনেক দিক থেকেই মহীনের ঘোড়াগুলিকে বাঙলার বিটলস আখ্যা দেয়াটা সম্ভবত অতিশয়োক্তি হবে না। বিটলস ষাটের দশকে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী, পপ এবং লোকসংগীতের মিশ্রণে ব্রিটিশ সঙ্গীতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল যা পরবর্তীতে ইউরোপ ও আমেরিকার পপ সঙ্গীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
মহীনের ঘোড়াগুলিও অনুরূপ একটি ধারা তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। আক্ষেপের ব্যাপার হল, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে এত অগ্রসর হয়েও কলকাতা তাদের সে উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি। আর বাংলায় গান গাওয়ার কারণে মহীনের ঘোড়াগুলি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। যদিও মহীনের ঘোড়াগুলি পশ্চিমা রক নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছে, সন্দেহ নেই তার শেকড় প্রোথিত ছিল কলকাতায়, জীবনানন্দের বাংলায়। শুধু ব্যান্ডের নামেই নয়, এর গানের কথায়ও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম, “সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক”, বের হয় ১৯৭৭ সালে। এই অ্যালবামের প্রথম গান ‘হায় ভালোবাসি’ বাংলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ, কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের হতাশার মুখে সে ভালবাসা ম্লান হয়ে পড়ে। এক অর্থে এই গান সলিল চৌধুরীর ‘প্রান্তরের গান আমার’ (শিল্পীঃ উৎপলা সেন, ১৯৫৪) গানটির রক-পপের কাঠামোয় একটি নতুন রূপ। তেতাল্লিশের মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে সলিল চৌধুরীর তরুণ বয়সে রচিত এই গানের কথা ও সুর বিষণ্নতা ও হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত। অপরদিকে ‘হায় ভালবাসি’ শুরু হয় সুখী ও উৎফুল্ল অভিব্যক্তির মাধ্যমে, আত্মমগ্ন প্রকৃতির একাগ্রতায়ঃ
ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে
ছায়া ঘেরা মেঠোপথে ভালোবাসি হাঁটতে
দূর পাহাড়ের গায়ে গোধূলীর আলো মেখে
কাছে ডাকে ধান খেত সবুজ দিগন্তে
কিন্তু পরক্ষণেই তা মোড় নেয় অনির্ণেয় সংশয় ও বিষাদে, যার ভাষা সলিল চৌধুরীর গানের ভাষার প্রায় অনুরূপ। কোরাসে এসে আমরা জানতে পারি সেই বিষাদের কারণ – তা মাড়ি বা মন্বন্তর নয় – তা হলো গ্রাম ও শহরের কর্মজীবী শ্রেণির নিয়তিহীন জীবনের প্রতি সমবেদনা। কিন্তু এই উপলব্ধি কোনো বৈপ্লবিক জাগরণের আহ্বানে পর্যবসিত হয় না যদিও ব্যান্ড সদস্যদের নকশালবাড়ি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা বিবেচনা করলে এরকম আহ্বান অপ্রত্যাশিত ছিল না। বরং এই গানের কোরাস শেষ হয় সুদিনের আগমনের আহ্বানে, যে সুদিনের ভালোবাসা সবাইকে একসূত্রে বাঁধতে পারবে। এক অর্থে তা রবীন্দ্রনাথের গানের (‘ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ/ নেব রে লুঠ করে’) মত নম্রতা ও সংকল্পের এক সুসমন্বিত সংমিশ্রণ।
সমাজ ও জীবন সম্পর্কে পর্যায়ক্রমিক উপলব্ধির উপস্থাপন মহীনের ঘোড়াগুলির গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যার ভিত্তি সম্ভবত বাউল গানের ঐতিহ্য। ষাট দশকের আমেরিকা ও ইউরোপে যে কাউন্টার কালচার বা মূলধারা বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গানের জগতকে ওলটপালট করেছিল তা মহীনের ঘোড়াগুলির গানের বাণীকেও প্রভাবিত করেছিল। হয়ত সে কারণে অনেকে এই ব্যান্ডের গানের স্টাইল বব ডিলানের গানের স্টাইলের সাথে তুলনা করেছে। কিন্তু মহীনের ঘোড়াগুলির গানের বিশেষত্ব শুধু গানের বাণীতে নয়, সঙ্গীত আয়োজনেও, তাদের হারমোনি ও কাউন্টার-মেলোডির ব্যবহারে। মহীনের ঘোড়াগুলির অনেক আগে সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁদের গানে হারমোনি ও কাউন্টার-মেলোডির ব্যবহার করেন যাতে যন্ত্রসঙ্গীত ও হারমোনি মূল সুর অনুকরণ না করে মূল সুরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সলিলের বা সুধীনের গান যেখানে পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রা ও হারমোনির স্টাইল দ্বারা প্রভাবিত, মহীনের ঘোড়াগুলি সেখানে জাজ ও বাউল ঘরানার ইমপ্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন দ্বারা প্রভাবিত। যারা বিটলস্ এর ‘পেনি লেইন’ বা ‘নোহোয়ার ম্যান’ গান এর সাথে পরিচিত তারা সহজে এই স্টাইল অনুধাবন করতে পারবে । বব ডিলানের ধরণ সর্ম্পূর্ণ আলাদা। বব ডিলান আমেরিকান ফোক-ব্লুজ ও প্রতিবাদী সঙ্গীতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন এক নতুন শৈলী যেখানে যন্ত্রসঙ্গীতের ব্যবহার প্রধানত গিটার ও হারমোনিকায় সীমাবদ্ধ। অপরদিকে মহীনের ঘোড়াগুলি বাংলা লোকসংগীত, জ্যাজ এবং নাগরিক রক মিশ্রণের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তন করেছে তার ‘বাউল-জাজ’ শৈলী।
সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক অ্যালবামের চারটি গানের আরেকটি গান হলো ‘কলকাতা কলকাতা’। কলকাতা নিয়ে অনেক গান রয়েছে যেগুলির মূল উপজীব্য শহরটির মহিমাকীর্তন। কিন্তু ‘কলকাতা কলকাতা’ গানটির উপজীব্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় আর তুচ্ছ স্মৃতি। এই নস্টালজিয়া ‘মেরুন সন্ধ্যালোক’ গানে এসে রূপান্তরিত হয় নাগরিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিতে। এই অনুভূতি সব নাগরিক সমাজে চিরন্তন, কিন্তু সত্তুর দশকের কলকাতার রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই অনুভূতির একটি গভীর তাৎপর্য ছিল, যার ইঙ্গিত মিলে গানটির কথায়ঃ
দিন চলে যায়, সন্ধ্যা বেলায়
বসে একা উদাস হাওয়ায়
যতো ভাবি সুর, বন পথ দূর
মাঝে ডাকে মহুয়া মুকুল।
সুর সরিয়ে শুধু এই কথাগুলি পাঠ করলে মনে আসে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ‘দিন চলে যায়, সবই বদলায়’ গানটি (শিল্পীঃ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুরঃ সলিল চৌধুরী, ১৯৬৭)। বিষণ্নতা, সময় হারানোর বেদনা ও অস্তিত্ববাদী নিংসঙ্গতা উভয় গানের অভিন্ন বিষয়। পার্থক্য হল, গৌরীপ্রসন্নের গানটি প্রচলিত বাঙলা সুরে গীতিধর্মী গান, আর মহীনের ঘোড়াগুলির গানটি নীরিক্ষাধর্মী – রক ও লোক গানের সংমিশ্রণ।
ব্যান্ডের দ্বিতীয় অ্যালবাম, “অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব”, ছিল আরো ছোট। মাত্র দুইটি গানের এই অ্যালবাম বের করেছিল হিন্দুস্তান রেকর্ডস, ১৯৭৮ সালে। এর প্রথম গান, অজানা উড়ন্ত বস্তু (কথাঃ রঞ্জন ঘোষাল, সুরঃ প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়) আবারও প্রমাণ করে যে ব্যান্ডটি বব ডিলানের স্টাইলের চেয়ে বিটলসের স্টাইলের অধিকতর নিকটবর্তী। এই গানটিতে শ্রমজীবী শ্রেণির (কেরানী) জাগতিক জীবন এবং বিচ্ছিন্ন অভিজাত শ্রেণির জীবনযাপনের মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরতে ইউ-এফ-ও এর রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিভিন্ন চিত্রকল্পের ব্যবহার (অজানা ইথার; টিভির অ্যান্টেনা যেন বা মাছের কাঁটা) বিটলসের ‘ইয়েলো সাবমেরিন’, ‘লুসি ইন দ্য স্কাই’ বা ‘সার্জেন্ট পেপার’স লোনলি হার্টস ক্লাব’ এর কথা মনে করিয়ে দেয়। দ্বিতীয় গান ‘শোনো সূধীজন’ (কথাঃ রঞ্জন ঘোষাল; সুরঃ গৌতম চট্টোপাধ্যায়) ভদ্র সমাজের কপটতা ও ভণিতার একটি ব্যাঙ্গাত্মক উপস্থাপন। ব্যান্ডের তৃতীয় অ্যালবাম “দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি” ভারতী রেকর্ডস থেকে বের হয় ১৯৭৯ সালে। এই অ্যালবামেও ছিল মাত্র দুইটি গান, ‘এই সুরে বহুদূরে’ (কথা ও সুরঃ তাপস দাস) এবং ‘যে গেছে বনমাঝে’ (কথাঃ রঞ্জন ঘোষাল, সুরঃ প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়)। এই গান দুটি শুধুমাত্র রেকর্ডর এপিঠে ওপিঠে উপস্থাপিত নয়, মর্ম ও বাণীতে তারা একে অপরের বিপরীত; প্রথমটি গানটির কথায় ব্যক্ত হয়েছে স্বপ্নজয়ের আকাঙ্খা, আর দ্বিতীয়টিতে সঙ্গীহারানোর বেদনা।
বলাবাহুল্য, তিনটির কোনো অ্যালবামই বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। এইচএমভি’র মত বড় রেকর্ড কোম্পানী তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করলে হয়ত অ্যালবামগুলি জনপ্রিয় হতে পারত। কিন্তু এইচএমভি নিশ্চয় জানত সিনেমার জনপ্রিয় গান বাদ দিয়ে মহীনের ঘোড়াগুলির অচেনা ধারার গান থেকে মুনাফা অর্জন সহজ হবে না। ছয় বছরের যাত্রাপথে মহীনের ঘোড়াগুলি কলকাতার রবীন্দ্র সদন, দিল্লীর ম্যাক্সমুলার ভবন এবং কলকাতা আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবের মত মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করে। তা সত্ত্বেও এর সংগঠকরা ব্যান্ড টিকিয়ে রাখবার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সহায়তা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। ফলে, তৃতীয় রেকর্ড বের হবার দুই বছর পরে তাঁরা ব্যান্ড ভেঙে দেন।
কিন্তু অর্ধশতক পরে তাঁদের গান পুনরুজ্জীবিত হয় নতুন আঙ্গিকে, এবং বিশেষত কলকাতার তরুণদের তা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। ব্যান্ড ভেঙে যাবার দেড় দশক পরে, এর প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চট্টোপাধ্যায় উৎসাহী কিছু তরুণের প্রেরণায় সম্পাদনা করেন নতুন অ্যালবাম, “আবার বছর কুড়ি পরে”। আশা অডিও থেকে এই অ্যালবাম বের হয় ১৯৯৫ সালে – মহীনের ঘোড়াগুলি প্রতিষ্ঠিত হবার ঠিক বিশ বছর পরে। এই সময়কাল গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে অ্যালবামের নামকরণে জীবনানন্দের “বনলতা সেন” এর বিখ্যাত লাইন ব্যবহার করবার এক অনন্য সুযোগ করে দেয়। এই নামকরণ থেকে আবারও প্রমাণিত হয় যে বাঙলা গানে পশ্চিমা ঘরানার প্রবর্তন করলেও বাংলা সংস্কৃতির প্রতি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গভীর অনুরাগ ছিল। এই অ্যালবাম আগের সবগুলি অ্যালবামের চেয়ে দীর্ঘ। এর আটটি গানের বেশিরভাগের গীতিকার গৌতম চট্টোপাধ্যায়, কিন্তু গানগুলি গেয়েছে নতুন ব্যান্ড ও তরুণ শিল্পীরা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এত বছর পর মহীনের ঘোড়াগুলি পুনর্গঠন করবার আর সুযোগ ছিল ন। কিন্তু এই অ্যালবাম বের হবার পর মহীনের ঘোড়াগুলির গান ও তার কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে কলকাতা নতুন করে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই অ্যালবামের একটি গান, ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’ (কথা ও সুরঃ গৌতম চট্টোপাধ্যায়) এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে তা বলিউডের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার সত্ত্বেও বিচ্ছিন্নতাবোধ যে কত ব্যাপ্ত ও গভীর রূপ লাভ করছে তা তুলে ধরা এই গানটির মূল উদ্দেশ্য। বলিউডের “গ্যাঙস্টার” (২০০৬) ছবিতে এই গানের সুর নকল করে প্লেব্যাক করা হয় ‘ভেগি ভেগি’ নামের একটি গান, যাতে কন্ঠ দিয়েছেন বাংলাদেশের পপ গায়ক জেমস। গৌতম চট্টোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে অবশ্যই বলিউডের এই চৌর্যবৃত্তি এত সহজ হত না। সঙ্গীতের বাইরে চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর দৃঢ় পদচারণা ছিল। মহীনের ঘোড়াগুলি ভেঙে যাবার পর তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় নিয়োজিত হন এবং তাঁর “নাগমতি” ছবি ১৯৮৩ সালে শ্রেষ্ঠ বাঙলা ছবি হিসেবে রজত কমল পদক পায়। তাঁর গান নিয়ে বলিউডের চৌর্যবৃত্তি অবশ্য শাপে বর হয়। ভেগি ভেগি বাজারে আসার সাথে সাথে বাঙালি শ্রোতারা চিনে ফেলে যে সেটা গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট ছোট হতে হতে’ গানের নকল। ফলে গানটি আগের চেয়ে আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
“আবার বছর কুড়ি পরে” প্রকাশিত হবার পর, পরবর্তী তিন বছরে আরো তিনটি অ্যালবাম প্রকশিত হয় – “ঝরা সময়ের গান”, “মায়া” ও “ক্ষ্যাপার গান”। অর্ধ শতক পরে এই ব্যান্ডের সৃষ্ট নতুন শৈলীর ক্রমবর্ধিষ্ণু জনপ্রিয়তা থেকে এটা সহজে ধারণা করা যেতে পারে যে সত্তুর দশকে এই ব্যান্ডটি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা শ্রোতাদের সমর্থন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল কারণ ব্যান্ডটির সঙ্গীতশৈলী সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল। গৌতম চট্টোপাধ্যায় অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করে বলতেন, “আমরা সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম না, পশ্চিম বাঙলা পিছিয়ে ছিল।” তিনি এটাও বলতেন যে, ”আজ যদি দশজনও আমাদের গান বোঝে, একদিন হাজারজন তা বুঝবে।” সন্দেহ নেই নিজের ও তাঁর সঙ্গীদের সৃষ্টিকর্মে তাঁর দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ছিল, এবং আমাদের সময়ে তাঁদের গানের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে সেই আত্মবিশ্বাস নিছক আত্মম্ভরিতা ছিল না।